গাজীপুরের জয়দেবপুরে ডোবার পানিতে স্যুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় পাওয়া খণ্ডিত ও অর্ধগলিত নারীর মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সেই সঙ্গে এই হত্যার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নিহত ডলি আক্তারের (৩০) কথিত প্রেমিক মিশন ইসলাম (২২), তার মা বানু আক্তার (৪৩) ও মিশনের বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টন (২৪)।
এ বিষয়ে সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বটি দা, মৃতদেহ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, নিহতের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি কার্ড), মোবাইল ফোন ও জুতা উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংবাদ সংস্থা ইউএনবি’র খবরে বলা হয়।
গত ১১ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানার ভবানীপুর এলাকায় হামজা অ্যাপারেলস লিমিটেডের উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশের একটি ডোবা থেকে স্যুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা খণ্ডিত ও অর্ধগলিত নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের পরিচয় তখন শনাক্ত করা যায়নি।
ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছায়া তদন্ত শুরু করে। ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সোর্সের মাধ্যমে তদন্ত চালিয়ে নিহতের পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে পিবিআই।
বিজ্ঞপ্তিতে পিবিআই জানায়, ডলি আক্তার জয়দেবপুরের বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ী এলাকায় ভাড়া বাসায় একা থাকতেন। স্বামীর সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সোহেল (৪৪) গেল ১২ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা ও মরদেহ গুমের অভিযোগে মামলা করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই গাজীপুরের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী। পিবিআই গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে তদন্তটি পরিচালিত হচ্ছে।
তদন্তে মিজানুর রহমান মিল্টনকে ১২ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে এবং মিশন ইসলাম ও তার মা বানু আক্তারকে একই দিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে গাজীপুর মহানগরের সদর মেট্রো থানার বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকার পৃথক ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিশনের ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে একটি বটি দা, স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, ডলির এনআইডি কার্ড, ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া স্যুটকেস কেনার বিষয়ে তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

হত্যাকাণ্ড যেভাবে ঘটানো হয়
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানানো হয়, ডলি আক্তারের সঙ্গে মিশন ইসলামের প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা একই গার্মেন্টসে চাকরির সুবাদে পরিচিত হন। ডলি প্রায়ই মিশনের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন।
গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের বাসায় যান। সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে বানু পাশের কক্ষে ঘুমাতে গেলে মিশন ও ডলি একই কক্ষে ছিলেন।
মিশনের জবানবন্দি অনুযায়ী, বিয়ে ও আগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধের জেরে তার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে সে ডলিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই রাতে মিশন ডলিকে ঘুমের ওষুধ ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ান। ডলি ঘুমিয়ে পড়লে রাত ২টার দিকে মিশন লুঙ্গি দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করেন। পরে মরদেহটি চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখেন।
পরদিন সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির মরদেহ দেখতে পান। পরে মিশন মরদেহ গুমের জন্য একটি স্যুটকেস কেনেন। মরদেহটি স্যুটকেসে না ধরায় ব্লেড ও বটি দা দিয়ে কোমর থেকে দুই খণ্ড করেন। পরে মরদেহের একাংশ স্যুটকেসে এবং অন্য অংশটি পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়।
পরে বন্ধু মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে নেন মিশন। মিল্টন স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলতে সহযোগিতা করেন। এরপর তারা তিনজন মিলে সেগুলো অটোরিকশায় রাজেন্দ্রপুর এবং সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ভবানীপুর এলাকায় নিয়ে যান।
পিবিআই জানায়, ভবানীপুর ব্রিজ এলাকা থেকে মিশন ও মিল্টন স্যুটকেস ও বস্তাটি ডোবার পানিতে ফেলে দেন। সে সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লাগলে তিনি স্যুটকেস ও বস্তার ভেতরে কী রয়েছে তা জানতে চান। তখন মিশন স্যুটকেসের মধ্যে তার প্রেমিকা ডলি আক্তারের মরদেহ রয়েছে বলে জানান।
পিবিআই গাজীপুরের পুলিশ সুপার রকিবুল আক্তার বলেন, মরদেহটি অজ্ঞাত ও পচনশীল হওয়ায় প্রথমে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। তবে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সোর্সের সমন্বিত ব্যবহারে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্তে পাওয়া আলামত ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনায় হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়েছে। অপরাধী যত কৌশলেই অপরাধ করুক, পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
গ্রেপ্তার তিনজনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না এবং ঘটনার অন্যান্য দিক ও আলামত তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।


