যুক্তরাজ্য ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে একটি চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছেন স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা। অঞ্চলগুলো যুক্তরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত চারটি স্বায়ত্তশাসিত দেশের তিনটি অংশ। দেশগুলোর কোনোটিই পূর্ণ স্বাধীন নয়।
দ্য টেলিগ্রাফের খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় সোমবার কার্ডিফে এক নজিরবিহীন সম্মেলনে তিন দেশের মুখ্যমন্ত্রীরা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করবেন। এতে স্বাধীনতার গণভোট আয়োজনের অধিকার দাবি করা হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সম্প্রতি পার্লামেন্টের সদস্যদের বলেছেন, যদি স্বাধীনতার গণভোটের পক্ষে ‘স্পষ্ট ঐকমত্য’ তৈরি হয়, তাহলে তিনি আরেকটি স্কটিশ গণভোটের অনুমোদন দিতে পারেন।
এর দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমি “একীভূত আয়ারল্যান্ড” দেখতে চাই।’ শনিবার ডাবলিন সফরের সময় তিনি বলেন, উত্তর আয়ারল্যান্ড যদি আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়, তা ‘একটি দারুণ বিষয়’ হবে। সাংবাদিকদের তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘এটি কীভাবে খারাপ হতে পারে?’
গত জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ক্ষমতাসীন লেবার দলের নেতা বার্নহ্যাম ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণকে তার প্রধান এজেন্ডার কেন্দ্রে রাখলেও জাতীয়তাবাদী নেতাদের চাপের মুখে ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা ও স্কটল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী জন সুইনি দাবি করেছেন, বার্নহ্যাম এখন ‘যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাওয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করছেন।
মে মাসের নির্বাচনে ওয়েলসে লেবার পার্টির বড় পরাজয়ের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যের তিনটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ক্ষমতায় রয়েছে স্বাধীনতাপন্থী দল।
ওয়েলসের সেনেডে সবচেয়ে বড় দলে পরিণত হয়েছে প্লেইড কামরু। দলটির নেতা রুন আপ আইওয়ার্থ দেশটির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
অন্যদিকে, সংস্কারবাদী দল ও গ্রিন পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়ায় স্কটল্যান্ডের হলিরুডে ছয়টি আসন হারালেও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি সেখানে নিজেদের প্রধান শক্তি হিসেবে ধরে রেখেছে।
২০২২ সালের উত্তর আয়ারল্যান্ডের আঞ্চলিক আইনসভা স্টরমন্ট অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের পক্ষে থাকা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল সিন ফেইন। তবে ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির নির্বাচন বর্জনের কারণে সিন ফেইনের শীর্ষ নেতা মিশেল ও’নিলকে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আগামী বছর আবার নির্বাচন হলে সিন ফেইনই ক্ষমতা ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের তিন নেতার সঙ্গে সিন ফেইনের সভাপতি ও বিরোধীদলীয় নেতা মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও কার্ডিফ উপসাগরের পাশে অবস্থিত পাঁচ তারকা সেন্ট ডেভিডস হোটেলে বৈঠকে যোগ দেবেন। তিনিও আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণের পক্ষে। সেখানে তারা নতুন করে স্বাধীনতার আন্দোলনে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করবেন।
রোববার সুইনি বলেন, ‘প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে স্বাধীনতাপন্থী মুখ্যমন্ত্রীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর চেয়ে পরিষ্কার কোনো সংকেত হতে পারে না যে বর্তমান পরিস্থিতি টেকসই নয় এবং ওয়েস্টমিনস্টারকে যুক্তরাজ্যপরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।’
‘গুরুতর সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে জনমত অস্বীকার করার উপায় নেই। অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে এখন উপলব্ধি করতে হবে যে তিনি যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারেন। আগামীকাল কার্ডিফে আমি এসব দ্বীপ অঞ্চলের অংশীদারদের সঙ্গে আরও ভালো ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আর সেই ভবিষ্যৎ কেবল স্বাধীনতার নতুন সূচনার মাধ্যমেই সম্ভব’, যোগ করেন তিনি।
জানা গেছে, তিন মুখ্যমন্ত্রী সম্মেলনে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করবেন, যেখানে তাদের নিজ নিজ দেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হবে।
দ্য টেলিগ্রাফকে একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বুধবার পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে বার্নহ্যামের মন্তব্যের পর তার ওপর আরও চাপ তৈরিই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, জনগণের সমর্থন থাকলে আবারও স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার গণভোট হতে পারে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, বিচ্ছিন্নতার ভোট আয়োজনের শর্ত স্কটল্যান্ডের ক্ষেত্রে উত্তর আয়ারল্যান্ডের মতোই।
গুড ফ্রাইডে চুক্তির অধীনে আয়ারল্যান্ড পুনরেকত্রীকরণের গণভোট আয়োজনের একটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে চাইবেন বলে মনে হলে গণভোট আয়োজন করা উচিত।
সুইনির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, ‘বার্নহ্যাম স্কটল্যান্ডের ক্ষেত্রে উত্তর আয়ারল্যান্ডের যুক্তি ব্যবহার করে ভুল করেছেন এবং পরে আবার স্কটল্যান্ডের বিষয়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডের যুক্তি ব্যবহার করে একই ভুল করেছেন।’
ওই সূত্র আরও বলেছে, ‘বার্নহ্যাম নিজের দায়িত্বের বিষয়গুলো ভালোভাবে পড়েননি এবং যুক্তরাজ্যের ঐক্য নিয়ে সরকারের মৌলিক অবস্থানও জানেন না। আমি যদি একজন ঐক্যপন্থী হতাম, তাহলে অবশ্যই উদ্বিগ্ন হতাম।’
সোমবার বৈঠকের পর তিন মুখ্যমন্ত্রী একটি সমঝোতা স্মারকে সই করবেন এবং সংবাদ সম্মেলন করবেন। তাদের চুক্তিতে চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে—অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।
ধারণা করা হচ্ছে, তিন দলই একমত হবে- তাদের দেশগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা উচিত। এর মধ্যে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস নতুন সদস্য হিসেবে এবং আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের অংশ হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্ত হবে।
জানা গেছে, স্বাধীনতার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইউরোপের ‘প্রতিবেশী’ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও সমঝোতা স্মারকে অঙ্গীকার থাকবে। অর্থনীতি বিষয়ক অংশে বলা হবে, যুক্তরাজ্যের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের মানুষের জন্য কার্যকর হচ্ছে না।
ওয়েলসের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পক্ষের জাতিয়তাবাদী দল প্লেইড কামরু বৈঠকটি ব্যবহার করে বার্নহ্যামের ওপর চাপ বাড়াতে পারে, যাতে ওয়েলস সরকারকে কর ও ব্যয়ের বিষয়ে আরও ক্ষমতা দেওয়া হয়।
দলটি ক্রাউন এস্টেট (রাজতন্ত্র) থেকে পাওয়া রাজস্ব, যার মধ্যে সমুদ্রতলও রয়েছে, সেখানে সমুদ্রভিত্তিক বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলে তা ওয়েলসের হাতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। বর্তমানে এসব অর্থ ব্রিটিশ সরকারের কোষাগারে যায়।
প্লেইড কামরু আরও চায়, লেবার পার্টি যেন বার্নেট সূত্রের পরিবর্তে আরও সুবিধাজনক অর্থ বণ্টন ব্যবস্থা চালু করে এবং পুলিশিং ও রেল অর্থায়নের মতো আরও কিছু ক্ষেত্রের ক্ষমতা ওয়েলসের কাছে হস্তান্তর করে।
দলটির এক সূত্র বলছে, ‘জ্বালানি, অর্থনীতি ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের মতো বিষয়ে বাস্তব রাজনৈতিক সহযোগিতার শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের দেশগুলোর সামনে থাকা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়েও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। আমাদের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে এবং যেখানে সহযোগিতা মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে, সেখানে অংশীদার ও সমান মর্যাদার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করে আমাদের দলগুলোর অনেক কিছু অর্জনের সুযোগ রয়েছে।’
সিন ফেইনের সূত্রমতে, নেতারা আলোচনা করবেন কীভাবে প্রতিটি দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রাখে।
সূত্রটি বলেছে, ‘গুড ফ্রাইডে চুক্তি আমাদের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার গণতান্ত্রিক সুযোগ দিয়েছে এবং এখন সেই পছন্দের জন্য গুরুত্বের সঙ্গে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এসেছে। আয়ারল্যান্ডের একত্রীকরণ কোনো দূরের স্বপ্ন নয়। নতুন আয়ারল্যান্ড গড়ার কাজ এখনই শুরু করতে হবে।’
অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার সুইনিকে পাঠানো এক চিঠিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে আরেকটি স্কটিশ স্বাধীনতা গণভোট আয়োজনের কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার গণভোটের পক্ষে কোনো ঐকমত্য নেই এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বর্তমানে যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হতে চান—এমন স্পষ্ট কোনো ভিত্তিও নেই।’
বার্নহ্যাম লেখেন, ‘২০২৪ সালের নির্বাচনে যে ইশতেহারের ভিত্তিতে লেবার পার্টি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, সেখানে বিষয়টি স্পষ্ট ছিল—লেবার পার্টি স্বাধীনতা বা আরেকটি গণভোট সমর্থন করে না। গ্লাসগোতে সাম্প্রতিক বৈঠকে আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে যেমন বলেছি, স্বাধীনতা ও গণভোটের বিষয়টি এখন আলোচনার বাইরে। কারণ এগুলো আমাদের অর্থনীতি বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দিকে মনোযোগ থেকে সরিয়ে দেবে।’


