হিজড়াদের একাংশের ‘গুরুমা’ মোহাম্মদ মহসীন ওরফে মৌসুমী হিজড়ার কাছে থাকা কিছু আপত্তিকর ছবি ও ভিডিওই শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব ছবি-ভিডিও দিয়ে মোমিন ওরফে শেখ রনিকে ব্ল্যাকমেইল করে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করতেন মৌসুমী।
ঘটনার রাতে তার ডাকে চট্টগ্রাম খুলশী আমবাগানের বাসায় গিয়ে একই বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মোমিন দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করেন বলে স্বীকার করেছে।
বায়েজিদ বোস্তামী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফ হোসেন বলেন, ছবি ও ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল এবং জোর করে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করার ক্ষোভ থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে হত্যার পেছনে টাকা লুট বা চুরির কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে নগরের পাহাড়তলী থানার সাগরিকা স্টেডিয়ামের পাশের এলাকা থেকে মোমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে শনাক্ত করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মোমিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার সব্দলপুর গ্রামের ছেলে। তিনি বর্তমানে পাহাড়তলী থানার সাগরিকা স্টেডিয়ামের পাশের খ্রিস্টান পাড়া (পাঠানপাড়া) এলাকায় ফাল্গুনী হিজড়া নামের এক নেত্রীর বাড়িতে থাকতেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ফাল্গুনী হিজড়ার ‘কথিত স্বামী’ হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমবাগান রেলওয়ে কলোনি সংলগ্ন হিজড়া কলোনির একটি বাসা থেকে মৌসুমী হিজড়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই বাসায় একাই থাকতেন।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে নামে পুলিশ। মৌসুমীর বাসায় থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা যায়, শুক্রবার রাত ১টা ১৪ মিনিটে সাদা টি-শার্ট পরা এক যুবক মৌসুমীর ঘরে ঢোকেন। প্রায় তিন ঘণ্টা পর রাত ৩টা ৫২ মিনিটে তাকে ওই ঘর থেকে বের হতে দেখা যায়।
ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই যুবককে মোমিন হিসেবে শনাক্ত করে পুলিশ। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করে সোমবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমী ও মোমিনের মধ্যে দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। মৌসুমী শারীরিক সম্পর্কের জন্য মোমিনকে টাকা দিতেন। তবে মোমিন তাকে পছন্দ করতেন না এবং তার কাছে যেতে চাইতেন না।
বায়েজিদ বোস্তামী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফ হোসেন বলেন, মৌসুমীর কাছে মোমিনের কিছু আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছিল। এসব ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মৌসুমী তাকে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করতেন এবং নিজের কাছে যেতে বাধ্য করতেন।
ঘটনার রাতে মৌসুমীর ডাকেই মোমিন তার ঘরে যান। সেখানে ছবি-ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মোমিন দড়ি দিয়ে মৌসুমীর গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করেন। পরে মোমিন ওই বাসা থেকে বেরিয়ে যান বলে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়।
হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মৌসুমী তার খামারের একটি গরু বিক্রি করেছিলেন। ওই গরু বিক্রির পাঁচ লাখ টাকা তিনি ঘরে রেখেছিলেন- এমন একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
তবে পুলিশ বলছে, ওই টাকা নেওয়ার জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজ এবং মোমিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি মৌসুমীর ঘর থেকে কোনো টাকা নেননি।
সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফ হোসেন বলেন, ‘মোমিন স্রেফ মৌসুমীর ডাকেই সেদিন রাতে সেখানে গিয়েছিলেন। টাকা চুরি বা লুটের কোনো উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়নি।’
খুলশী থানার পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার মোমিনকে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহিম বলেন, ‘হিজড়াদের একাংশের গুরুমা মৌসুমী হিজড়া হত্যাকাণ্ডের পর আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। সোমবার বেলা ১১টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। তিনি হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।’
ওসি আরও বলেন, আশা করি, আদালতেও তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন।


