‘গুলিতে স্বামীর দুই আঙুল উড়ে যায়, বুক ভেদ করে বেরিয়ে যায় গুলি’

‘গুলিতে স্বামীর দুই আঙুল উড়ে যায়, বুক ভেদ করে বেরিয়ে যায় গুলি’
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

গুলিতে আমার স্বামীর দুটি আঙুল উড়ে যায় এবং বুকে একটি গুলি লাগে। গুলিটি বুক দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালতে জবানবন্দি দিতে গিয়ে এভাবেই স্বামীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন মোছা. রুমা বেগম।

একচল্লিশ বছর বয়সী রুমা নিহত মো. জসিম উদ্দিনের স্ত্রী। তিনি জানান, তার স্বামী একটি এনজিওতে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহর উপস্থিতিতে জবানবন্দি দেন রুমা। এই মামলায় ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

জবানবন্দিতে রুমা জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তার স্বামী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তখন তারা আদাবর থানার শেখেরটেক ৬ নম্বর রোডে ভাড়া বাসায় থাকতেন। ওই দিন আন্দোলনে গিয়ে ধাওয়া খেয়ে আহত অবস্থায় বাসায় ফেরেন জসিম। আন্দোলনে যাওয়ার সময় তিনি তার গাড়ি ধানমন্ডির কোনো একটি জায়গায় রেখে গিয়েছিলেন।

স্বামীর আহত হওয়ার কারণে ১৯ জুলাই সকালে তাকে বাসা থেকে বের হতে দিতে চাননি রুমা। কিন্তু শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ার কথা বলে জসিম বাড়ি থেকে বের হন। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। তার মোবাইলে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রতিবেশি কোহিনুর বেগম জানান, তার ছেলে উজ্জল ফোন করে বলেছেন, জসিম আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে আছেন।

হাসপাতালের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায়

রুমা বলেন, খবর পেয়ে তিনি পাগলের মতো ছুটতে থাকেন। বাসায় থাকা অল্প টাকার সঙ্গে পাশের বাসার এক ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে আরও ১০ হাজার টাকা নেন। এরপর চাচা শ্বশুর মো. সালাম গাজীকে সঙ্গে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন। পথে পুলিশ তাদের বাধা দেয় বলে জবানবন্দিতে জানান তিনি। পরে হাসপাতালে পৌঁছে অপারেশন থিয়েটারের সামনে একটি ট্রলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে পড়ে থাকতে দেখেন।

এ পর্যায়ে জবানবন্দি দিতে গিয়ে রুমা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, তখন জসিমের জ্ঞান ছিল এবং তিনি তার সঙ্গে কথা বলেন। জসিম জানান, গুলিতে তার দুটি আঙুল উড়ে গেছে এবং বুকে একটি গুলি লেগেছে। রুমা বলেন, তিনি দেখতে পান, গুলিটি বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেছে। বুক ও পিঠের ক্ষতস্থানে গজ দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না।

জসিম তাকে জানান, জুমার নামাজ পড়ে তিনি আন্দোলনে অংশ নিতে মোহাম্মদপুর আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে গিয়েছিলেন। সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন বলে স্বামীর কাছ থেকে জানতে পারেন রুমা।

হাসপাতালে সাইফুল নামে এক আন্দোলনকারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সাইফুলই জসিমকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন বলে জানান তিনি। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের জন্য রক্তের প্রয়োজনের কথা জানালে রুমা সাইফুলকে টাকা দেন এবং তিনি দুই ব্যাগ রক্ত নিয়ে আসেন।

রুমার ভাষ্য, সেদিন হাসপাতালে এত বেশি গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারী এসেছিলেন যে চিকিৎসক ও নার্সরা তাদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। জসিমের জ্ঞান থাকায় তার অস্ত্রোপচার সবার শেষে হয়। রাত আনুমানিক আড়াইটায় অস্ত্রোপচার শেষ হলে তাকে অবজারভেশন রুমে রাখা হয়। সেদিন রুমাকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন

একে একে অবনতি

২০ জুলাই বেলা ১১টার দিকে অবজারভেশন রুমে ঢুকে রুমা দেখেন, জসিমের শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে এবং কোনোভাবেই তা বন্ধ করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, স্বামীর হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দেখেন, দুটি আঙুল নেই এবং সেখানে পচন ধরেছে। চিকিৎসকদের জানালে তারা বলেন, আঙুলগুলো গোড়া থেকে কেটে ফেলতে হবে। ২১ জুলাই জসিমের আঙুল কেটে ফেলা হয়।

২২ জুলাই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আইসিইউ খালি না থাকায় অনেক চেষ্টা করে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে একটি আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা করেন রুমা।

সেখানে জসিমের বুকে আরেকটি অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর আর তার জ্ঞান ফেরেনি। রুমার অনুরোধে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ২৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে জসিম মারা যান বলে জানান রুমা। এ সময় সাক্ষী আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মরদেহ নিতে থানায় দৌড়

রুমার জবানবন্দি অনুযায়ী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া জসিমের মরদেহ দিতে রাজি হয়নি। তারা বনানী থানায় গেলে পুলিশ জানায়, ক্লিয়ারেন্সের জন্য মোহাম্মদপুর থানায় যেতে হবে। মোহাম্মদপুর থানায় গেলে সেখান থেকে বলা হয়, তাদের এলাকায় গুলি হয়নি, তাই বনানী থানায় যেতে হবে। ২৯ জুলাই রাত থেকে ৩০ জুলাই দুপুর পর্যন্ত দুই-তিনবার বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় যাতায়াত করেন বলে জানান রুমা।

বেলা ৩টার দিকে হাসপাতালের সামনে তিন সন্তানকে নিয়ে কান্নাকাটি করে স্বামীর মরদেহ দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। পরে একজন তাকে হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষে যেতে বলেন। পরিচালক বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় দুটি চিঠি পাঠান।

মর্গের এক কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে চিঠি হাতে বনানী থানায় যান রুমা। তার কোলে তখন সাত মাসের সন্তান ছিল। তার ভাষ্য, বনানী থানার ওসি তাকে বলেন, আমার কিছু করার নেই, ওপর মহলের হুকুমে ক্লিয়ারেন্স দিতে পারছি না।

পরে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করেন রুমা। তিনি বলেন, মামলা না করলে মরদেহ দেওয়া হবে না, এমন শর্ত ছিল। অনেক জটিলতার পর ৩১ জুলাই স্বামীর মরদেহ পান তিনি। সন্ধ্যায় মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। ফজরের আজানের সময় সেখানে পৌঁছান এবং সকাল ৮টার দিকে জসিমকে দাফন করেন।

নির্দেশে কারা জড়িত

রুমা বলেন, পরে তার মেয়ে লামিয়ার ফোনে তিনি দেখতে পান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়েছেন। এর কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরে ফেসবুক, ইউটিউব, সংবাদপত্র, ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন; শেখ হাসিনা, মেয়র তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশে পুলিশ কমিশনার হাবিব, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, বিপ্লব কুমার সরকার ও রওশানুল হক সৈকতদের সহায়তায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী ও অন্যরা জসিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

জবানবন্দিতে তিনি যাদের নাম উল্লেখ করেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন শেখ বজলুর রহমান, আজিজুল হক রানা, এম এ সাত্তার, মো. তোফায়েল সিদ্দিকি তুহিন, ইসমাইল হোসেন, আরিফুর রহমান তুহিন, কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ, জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস মাসুদুর রহমান বিপ্লব, কাউন্সিলর তারিকুজ্জামান রাজীব, কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নুর ইসলাম রাস্ট্রন, বিচ্ছু জালাল, আহাদ হোসেন সোহাগ, রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়, নাঈমুল হাসান রাসেল, মো. সাজ্জাদ হোসেন, নুর মোহাম্মদ সেন্টু, ফজলে রাব্বি, ইউনুস, মাইনুল ইসলাম পলাশ, মোল্লা রুবেলসহ আরও অনেকে।

রুমার দাবি, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তিনি আসিফ আহমেদ, তারিকুজ্জামান রাজীব, মাসুদুর রহমান বিপ্লব, আহাদ হোসেন সোহাগ ও ফজলে রাব্বীকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে গুলি করতে এবং মো. সাজ্জাদ হোসেনকে চাপাতি হাতে দেখেছেন। তিনি বলেন, গত ১৫ বছর ধরে শেখেরটেক ও মোহাম্মদপুর এলাকায় ভাড়া থাকায় তাদের অনেককে আগে থেকেই চিনতেন।

সাক্ষ্য দিতে আসার পর মেয়ের মৃত্যুর অভিযোগ

জবানবন্দিতে রুমা বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এ জন্য তিনি ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ ঢাকায় আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন ভাই মো. বেলাল মৃধা, মেজো মেয়ে বুশরা ও ছোট ছেলে জুবায়ের ইসলাম। বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হওয়ায় তাকে বাড়িতে রেখে আসেন।

রুমার দাবি, ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ লামিয়া বাবার কবর জিয়ারত করে ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন।

তিনি আরও দাবি করেন, তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণেই তার মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়। রুমার ভাষ্য, ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর তার মেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন। এ পর্যায়ে সাক্ষী আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন। জবানবন্দির শেষে রুমা বলেন, আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর