র‍্যাব পরিচয়ে জবি শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা, নেপথ্যে ‘পারিবারিক বিরোধ’

র‍্যাব পরিচয়ে জবি শিক্ষার্থীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা, নেপথ্যে ‘পারিবারিক বিরোধ’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

পুরান ঢাকার কলতাবাজারে র‍্যাবের পরিচয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সাবেক এক শিক্ষার্থীকে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী মমতাজ আরা বর্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

রোববার সকাল ৬টার দিকে কলতাবাজার খাদ্য গুদামের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত জানান মমতাজ।

তিনি অভিযোগ করেন, চুরির মালামাল কেনার একটি মামলার আসামি হিসেবে তাকে আটক করার কথা বলে একদল ব্যক্তি বাসায় ঢুকে তল্লাশি চালায়। পরে তাকে জোর করে গাড়িতে তোলা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হস্তক্ষেপ করল তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

মমতাজের অভিযোগ, সকালে পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি তাদের বাসার দরজায় এসে পরিচয় না দিয়ে দরজা খোলার জন্য চাপ দিতে থাকেন। প্রায় ১০ মিনিট তারা কোনো পরিচয় দেননি। একপর্যায়ে নিজেদের র‍্যাবের সদস্য বলে পরিচয় দিলেও তাদের নাম ও কোন ব্যাটালিয়ন থেকে এসেছেন–এমন প্রশ্ন করা হলে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি বলে দাবি তার।

দরজায় ধাক্কাধাক্কি ও জোরাজুরির একপর্যায়ে মমতাজ জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করেন। তার ভাষ্য, পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার পর ওই ব্যক্তিরা নিজেদের র‍্যাব সদস্য বলে জানান। পরে র‍্যাবের আরও কয়েকটি গাড়ি সেখানে আসে।

মমতাজ বলেন, র‍্যাব পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা প্রথমে তাদের বাসায় তল্লাশি চালান। তারা কী খুঁজছেন জানতে চাইলে স্পষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি। পরে তাকে বলা হয়, তার নামে মামলা হয়েছে এবং তাকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে যাওয়া হবে।

মামলাটি কে করেছেন, কী অভিযোগ ও তাকে আটকের কোনো কাগজ বা পরোয়ানা আছে কি না জানতে চাইলে ‘থানায় গেলে জানতে পারবেন’ বলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

মমতাজ বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি, আপনারা যে আমাকে নিয়ে যাবেন, ওয়ারেন্ট দেখান ও অপরাধ বলেন। কিন্তু তারা কোনো কাগজ দেখাননি।’

মমতাজের অভিযোগ, তাকে গাড়িতে তোলার আগে তার মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। ফোন বন্ধ করতে বলা হয় ও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে নিষেধ করা হয়।

পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য, শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুরা ঘটনাস্থলে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়। তারা ওই ব্যক্তিদের পরিচয়, নাম ও মমতাজকে নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চান।

মমতাজ বলেন, শিক্ষকরা বারবার র‍্যাব সদস্যদের পরিচয়পত্র দেখাতে বলেন। কিন্তু তারা কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় বা কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে শিক্ষকদের প্রশ্নের মুখে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে তার মুঠোফোনও ফেরত দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তাকে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান।

আরও পড়ুন

মমতাজের অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে চুরি করা সোনা কেনার অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু বাসায় তল্লাশি চালিয়ে কোনো চুরি করা মালামাল পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘আমার ঘর সম্পূর্ণ তছনছ করে খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে। কিন্তু আমার ঘর থেকে কিছু পাওয়া যায়নি।’

তার দাবি, পরে তিনি জানতে পারেন ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানায় তার বিরুদ্ধে চুরির মালামাল কেনার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলায় যে দুটি মুঠোফোন নম্বরের মাধ্যমে লেনদেনের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো তিনি ব্যবহার করেন না বলেও দাবি করেন।

মমতাজ বলেন, ‘আজকাল সবকিছু ডিজিটালাইজড। আমার নম্বর ট্র্যাক করলে বের করা সম্ভব আমি ওই নম্বর ব্যবহার করেছি কি না। প্রয়োজন হলে কলের তালিকা, লেনদেন ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হোক।’

ঘটনার পেছনে তার বোনের সাবেক স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে বলে দাবি করেন মমতাজ। তিনি জানান, তার বোনের সঙ্গে প্রায় সাড়ে চার বছর আগে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সাবেক ভগ্নিপতির নাম সুমন আহমেদ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, বোনের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ওই ব্যক্তির সঙ্গে তাদের পরিবারের বিরোধ চলছে।

মমতাজের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ, মানসিক হয়রানি ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় দিনাজপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তার দাবি, পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোন নম্বর পরিবর্তন করার পরও নতুন নম্বর সংগ্রহ করে হুমকি দেওয়া হয়েছে। তার বোনের বন্ধুদের কাছেও বিভিন্ন নম্বর থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মমতাজ বলেন, ‘আমরা তো সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এসেছি। মোহরানার টাকা চাইনি, সন্তানের বাবার কাছে কোনো দাবি করিনি, ভরণপোষণও চাইনি। তাহলে এই হয়রানি কেন!’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, তার বোনের সাবেক স্বামী তাদের পরিবারকে ‘এক সপ্তাহের মধ্যে খেলা দেখানোর’ হুমকি দিয়েছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ বলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তিনি বলেন, ‘আজ গুম হয়ে যেতে পারতাম, আমাকে নিয়ে যেতে পারত। শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুরা না থাকলে কী হতো, আমি জানি না।’

মমতাজ আরও বলেন, ‘তাহলে কি শুধু ক্ষমতা থাকলে সবকিছু সম্ভব! প্রশাসনের লোক হলে সবকিছু সম্ভব! সাধারণ মানুষ হলে আমি কোনো ন্যায়বিচার পাব না!’

সংবাদ সম্মেলনে মমতাজ তার বোনের সাবেক স্বামী সুমন আহমেদের বিরুদ্ধে র‍্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হয়ে কাজ করার অভিযোগও করেন। তার দাবি, সুমন আহমেদ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করেছেন এবং একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ‘প্রফেশনাল হ্যাকার’ হিসেবেও কাজ করতেন বলে অভিযোগ করেন মমতাজ।

মমতাজের ভাষ্য, তার বোনের সাবেক স্বামীর সঙ্গে তাদের পারিবারিক বিরোধের বিভিন্ন ঘটনা, হুমকি এবং আগের জিডির কাগজপত্র তার পরিবারের কাছে রয়েছে। তার বাবা-মা দেশের বাইরে থাকায় এসব নথি তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেননি বলেও জানান তিনি।

মমতাজ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তিনি জিডি করবেন। একই সঙ্গে নিজের, পরিবারের সদস্য ও রুমমেটদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভবিষ্যতে তার বা পরিবারের কারও ক্ষতি হলে রোববারের ঘটনাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো যেন আইনিভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, একজন শিক্ষার্থীকে র‍্যাবের গাড়িতে তোলা হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলি এবং শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলি।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা থাকলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান দায়িত্ব। ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।’

সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি জানার পরে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। যারা এসেছিল, তারা র‍্যাবের সদস্য। চুরির মালামাল কেনার একটি মামলায় ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিল। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, এটি পারিবারিক বিরোধের মামলা।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর