সড়ক দুর্ঘটনা/ আগস্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ জন নিহত

৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত এবং ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে।

আগস্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ জন নিহত
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

দেশে গত আগস্ট মাসে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত এবং ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ১৫ দশমিক ৫১ জন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী ও ৫৮ জন শিশু। এ সময়ে ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৬ জন, যা মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

সোমবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আগস্ট মাসের সড়ক দুর্ঘটনার এ চিত্র তুলে ধরে।

সংস্থাটি নয়টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২১ দশমিক ২০ শতাংশ। এ ছাড়া যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৭ জন, যা মোট নিহতের ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

এ সময়ে ৭টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৯ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ৩৪টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ২৩ জন আহত হয়েছেন।

প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, গত জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৩ দশমিক ৪১ জন নিহত হয়েছিলেন। আগস্টে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ১৫ দশমিক ৫১ জন। সে হিসাবে আগস্টে প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ, অধিকাংশ দুর্ঘটনা অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ঘটছে। এ কারণে প্রযুক্তির মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পথচারী নিহতের ঘটনাও বাড়ছে। বেপরোয়া যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি পথচারীদের অসচেতনতাকেও এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। এ জন্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বেশি প্রাণহানি

যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৭৬ জন নিহত হয়েছেন। বাসের যাত্রী নিহত হয়েছেন ৩৭ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, লরি ও ড্রাম ট্রাকের আরোহী ৫১ জন এবং মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার ও জিপের ১১ জন আরোহী নিহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া থ্রি-হুইলার—অটোরিকশা, অটোভ্যান, ইজিবাইক, সিএনজি ও লেগুনার—৭৮ জন যাত্রী, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের ২১ জন যাত্রী এবং রিকশা ও বাইসাইকেলের ৫ জন আরোহী নিহত হয়েছেন।

আঞ্চলিক সড়কেই বেশি দুর্ঘটনা

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগস্টে সংঘটিত দুর্ঘটনার মধ্যে ১৬৩টি জাতীয় মহাসড়কে, ২১৭টি আঞ্চলিক সড়কে, ৬২টি গ্রামীণ সড়কে এবং ৭১টি শহরের সড়কে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২৬টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৯৫টি নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে, ১০৬টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার কারণে এবং ৭৮টি যানবাহনের পেছনে আঘাত করার ঘটনায় ঘটেছে। বাকি ৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্যান্য কারণে।

ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা বেশি

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৭২টি দুর্ঘটনায় ১৪৪ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ১৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে, যেখানে নিহত হয়েছেন ১৪ জন।

একক জেলা হিসেবে বগুড়ায় সবচেয়ে বেশি ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় আগস্ট মাসে ৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক দুর্ঘটনার হিসাবে ঢাকা বিভাগে ৩৩ দশমিক ৫২ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ, খুলনায় ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, বরিশালে ২ দশমিক ৯২ শতাংশ, সিলেটে ৫ দশমিক ০৬ শতাংশ, রংপুরে ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দুর্ঘটনার প্রধান কারণ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মানসিকতা, শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল এবং তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোকে দায়ী করেছে।

এ ছাড়া ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

১২ দফা সুপারিশ

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

এ ছাড়া মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে প্রত্যাহার, রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, বিআরটিসির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ এবং প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে।

সবশেষে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর