অটোরিকশাচালক ইমন হত্যা: আসামি আল-আমিন শেখের যাবজ্জীবন

অটোরিকশাচালক ইমন হত্যা: আসামি আল-আমিন শেখের যাবজ্জীবন
আল-আমিন শেখ। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

রাজধানী ঢাকার কদমতলীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক কিশোর ইমন কাজীকে হত্যা ও মরদেহ গুমের ঘটনায় আসামি মো. আল-আমিন শেখকে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে ছয়মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া হত্যার আলামত নষ্ট ও মরদেহ গুমের দায়ে তাকে আরও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

এই হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের পর কেবল ১২ কার্যদিবসে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে রায় ঘোষণা করা হলো।

সোমবার ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-৩ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন চৌধুরী এই রায় দেন।

সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. জহিরুল ইসলাম (কাইয়ুম) বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিলাম। তবে আসামি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিবেচনা করে আদালত তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন।’

রায় ঘোষণার সময় আসামি উপস্থিত ছিলেন। সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অটোরিকশা মিললেও নিখোঁজ ছিলেন ইমন

মামলার অভিযোগ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩০ মে সন্ধ্যায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন কিশোর ইমন কাজী। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। রাত ৯টার পর থেকে তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। গভীর রাতে গেন্ডারিয়া থানার ফরাশগঞ্জের মামুর মাজারসংলগ্ন এলাকা থেকে চালকবিহীন অবস্থায় ইমনের অটোরিকশা ও এর ব্যাটারি উদ্ধার করা হয়। তবে তখনও ইমনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

পরদিন ৩১ মে ছেলে নিখোঁজের ঘটনায় কদমতলী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা মো. লিটন। চার দিন পর ৩ জুন রাতে পশ্চিম মোহাম্মদবাগের সোনামাবিয়া জামে মসজিদসংলগ্ন হাজী সোনা মিয়ার পতিত জমির ঝোপের ভেতরের একটি ডোবা থেকে ইমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি হাত-পা বাঁধা, বস্তাবন্দি ও অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল।

আরও পড়ুন

মামলার অভিযোগে বলা হয়, পূর্বপরিকল্পিতভাবে কোকাকোলার সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে ইমনকে পান করানো হয়। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়। পরে বাজার থেকে বস্তা ও রশি কিনে মরদেহটি বস্তাবন্দি করা হয়। এরপর রিকশাযোগে মরদেহ নিয়ে নির্জন একটি ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ইমনের বাবা মো. লিটন কদমতলী থানায় হত্যা ও মরদেহ গুমের অভিযোগে মামলা করেন।

সন্দেহ ও পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ

মামলাটির তদন্তে ইমন হত্যার নেপথ্যে আল-আমিন শেখের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। তদন্তে বলা হয়, পারিবারিক পরকীয়ার সন্দেহ এবং ধার দেওয়া পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ইমনের সঙ্গে আল-আমিনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
এই বিরোধের জেরেই ইমনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০ মে সন্ধ্যায় ইমনকে নিজের ভাড়া বাসায় ডেকে নেন আল-আমিন। সেখানে তাকে হত্যা করে মরদেহ বস্তাবন্দি করে নির্জন ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেপ্তার

মামলাটির প্রাথমিক তদন্ত করেন কদমতলী থানার এসআই আহমেদ নওয়াজিশ। পরে তদন্তভার ডিবিতে স্থানান্তর করা হলে ডিবি ওয়ারী বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক মো. রোকনুজ্জামান খাঁন তদন্তের দায়িত্ব নেন।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আল-আমিনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে ২০২৩ সালের ৫ জুন রাতে বরিশালের হিজলা থানার গোবিন্দপুর খন্না গ্রামে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আসামির দেখানো মতে তার ভাড়া বাসা থেকে ইমনের ব্যবহৃত স্মার্টফোন ও রক্তমাখা বিছানার চাদর উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।

এর আগে, আল-আমিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

১০ সাক্ষীর সাক্ষ্য, ময়নাতদন্তেও হত্যার প্রমাণ

তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

বিচারিক পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষে এজাহারকারী, সুরতহাল ও জব্দ তালিকার সাক্ষী, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক আসমাউল হুসনা, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও চিকিৎসকের সাক্ষ্যে উঠে আসে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধের কারণে ইমনের মৃত্যু হয়েছে।
আদালত আসামির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, আসামির হেফাজত থেকে ভিকটিমের মোবাইল ফোন ও রক্তমাখা বিছানার চাদর উদ্ধার এবং অন্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেন।

এসব সাক্ষ্য-প্রমাণে আল-আমিন শেখের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর