চলতি বছরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৯০ কোটি মানুষ ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই মাস অতিবাহিত করেছেন। এসব অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে সাহেল, মধ্য আমেরিকা, ফ্রান্স ও স্পেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কোপার্নিকাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে বার্তা সংস্থা এএফপি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
কোপার্নিকাসের ইআরএ৫ জলবায়ু মডেলের কোটি কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৭০ সাল থেকে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড রাখা শুরুর পর থেকে ৩৩টি দেশে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল এ বছর।
ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা মেতেও-ফ্রান্স এবং স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা এইমেটসহ কয়েকটি উন্নত দেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠানও স্বাধীনভাবে এই রেকর্ড তাপমাত্রার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
মূলত নিম্নআয়ের দেশগুলোর বিস্তারিত তথ্যের ঘাটতি থাকায় উপগ্রহ, স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পর্যবেক্ষণ ডাটা নিয়ে এএফপি স্বাধীনভাবে এই বৈশ্বিক বিশ্লেষণটি তৈরি করে।
সাহেল অঞ্চলে চরম গরম ও জলবায়ু ঝুঁকি
গড়ের চেয়ে বেশি উষ্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ৯০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি আফ্রিকায় বসবাস করেন, যাদের বেশিরভাগ সাহেল অঞ্চলের বাসিন্দা। মৌরিতানিয়া, নাইজার, বুরকিনা ফাসো, সুদান, কেনিয়া ও ইথিওপিয়াসহ সাহেল অঞ্চলের ১০টি দেশে জুলাইয়ের তাপমাত্রার সব রেকর্ড ভেঙে গেছে।
নিরক্ষরেখার কাছের দেশগুলোতে আবহাওয়ার ওঠানামা কম হলেও চাদ ও সুদানে জুলাইয়ের তাপমাত্রা ১৯৮১-২০১০ সালের গড়ের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল।
জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর (ডব্লিউডব্লিউএ) বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০১৫ সালের পর থেকে এমন চরম তাপপ্রবাহের ঘটনা ১০ গুণ বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত, খাদ্যসংকট ও দারিদ্র্যে জর্জরিত সাহেলভুক্ত দেশগুলো এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে।
এল নিনো ও বাড়তে থাকা খাদ্যসংকট
প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জলবায়ু পরিস্থিতি ‘এল নিনো’ জুনে শুরু হয়েছে, যা চলতি বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এর প্রভাবে মেক্সিকো থেকে উত্তর ব্রাজিল এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে গুয়ানা উচ্চভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বাস করা প্রায় ১১ কোটি মানুষ নজিরবিহীন গরমের মুখোমুখি হয়েছেন।
‘ড্রাই করিডোর’ নামে পরিচিত এল সালভাদর, নিকারাগুয়া ও হন্ডুরাসে জুন ও জুলাই–উভয় মাসেই তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, খাদ্যসংকটের তুলনামূলক বৃদ্ধির দিক থেকে মধ্য আমেরিকা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল হতে পারে।
সংস্থাটির আশঙ্কা, ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ নতুন করে আরও ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ চরম খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।
দাবানলে পুড়ছে ইউরোপ
ইউরোপের প্রায় ১২ কোটি মানুষ এমন অঞ্চলে থাকেন, যেখানে ২০২৬ সালের জুলাই ছিল সর্বকালের সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই। দক্ষিণ ব্রিটেন, পশ্চিম ফ্রান্স এবং উত্তর ও পূর্ব স্পেনে এই পরিস্থিতি প্রকট ছিল। ফ্রান্সে গড় তাপমাত্রা ১৯৯১-২০২০ সালের স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়।
ফ্রান্স ও স্পেনে একই সঙ্গে নজিরবিহীন খরা দেখা দেওয়ায় ভয়াবহ দাবানল তীব্র রূপ নেয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে ফ্রান্সের জিরন্দ বিভাগে দাবানলে ৪২ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে যায় এবং ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, স্পেনের মাদ্রিদের কাছে আভিলা প্রদেশে দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবানলে প্রায় ৪৪ হাজার হেক্টর এলাকা ভস্মীভূত হয়।
এ ছাড়া চীনের সিচুয়ান প্রদেশ, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং ও কলোরাডো এবং ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন কিছু অঞ্চলেও জুলাইয়ে রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা গেছে, যেখানে সম্মিলিতভাবে ২৫ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করেন।


