দেশের ব্যাংকিং খাতে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে একাধিক নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের প্রচলিত সুযোগ সীমিত করে নতুন এক্সিট পলিসি, অর্থঋণ আদালতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ এবং খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট থেকে সরিয়ে নিতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণার পর প্রশ্নোত্তর পর্বে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে আগামী ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তিনি বলেন, প্রথম ছয় মাসে নতুন এক্সিট পলিসি কার্যকর করা হবে। এর মাধ্যমে বুলেট পেমেন্টের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ ঝুলিয়ে রাখার সংস্কৃতি নিরুৎসাহিত করা হবে।
গভর্নরের ভাষায়, ‘আমরা আর বুলেট পেমেন্টকে উৎসাহিত করছি না। কোনো ব্যবসা টেকসই না হলে ব্যাংক চাইলে সেই সুবিধা বন্ধ করতে পারবে।’
তার আশা, এই নীতির ফলে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার সমন্বয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমে আসবে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি বাড়াতে অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনেরও প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর বলেন, বর্তমানে বছরের পর বছর মামলা চলায় ঋণ আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, অর্থঋণ আদালতের মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন (ডিএএমএ)। আইনটি কার্যকর হলে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের খেলাপি ঋণ ব্যালেন্স শিট থেকে আলাদা করতে পারবে।
গভর্নর বলেন, ‘আমরা চাই ব্যাংকগুলো একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি টক্সিক অ্যাসেট নিজেদের ব্যালেন্স শিটে রাখতে না পারে। এগুলো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ব্যালেন্স শিটে দীর্ঘদিন অকার্যকর ঋণ রেখে আর্থিক অবস্থার ভুল চিত্র তুলে ধরা ঠিক নয়। এজন্য ব্যাংকগুলোকে অকার্যকর ঋণ রাইট-অফ করতেও উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো ঋণ রাইট-অফ করা মানে ঋণগ্রহীতাকে দায়মুক্তি দেওয়া নয়। ‘রাইট-অফ করলেও ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে মামলা, সম্পদ উদ্ধারসহ সব আইনি কার্যক্রম চলবে,’ বলেন গভর্নর।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক মানের আইএফআরএস নাইন-ভিত্তিক বিশেষ কাঠামো বাস্তবায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিজোরদার এবং বিশেষ নিরীক্ষাও অব্যাহত থাকবে।
গভর্নর জানান, সম্প্রতি ছয়টি ব্যাংকে বিশেষ নিরীক্ষা চালিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় একাধিক অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতেও বিশেষ নিরীক্ষা চলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এক্সিট পলিসি, দ্রুত বিচার, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, আন্তর্জাতিক হিসাবমান এবং কঠোর তদারকি একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে আগামী বছর থেকে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।


