আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হলে একই ধরনের দায়ে হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের সাজা হতে পারে না।
মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জাসদ সভাপতি ইনুর মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়া জানান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আদালত সঠিকভাবে আইনের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারেনি।’
প্রসিকিউশনের মতে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধের ক্ষেত্রে তার দায় শেখ হাসিনার দায়ের সমপর্যায়ের। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অপরাধে শেখ হাসিনার যে দায়, ইনুরও একই দায়। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হলে ইনুর ১০ বছরের সাজা আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও বলেন, এসব দুষ্কৃতিকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পাবে। রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রসিকিউশন এই রায়ে মোটেই সন্তুষ্ট নয়। ইনুর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল।’ ট্রাইব্যুনাল সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। যে তিনটি অভিযোগে অপ্রতুল শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে সাজা বৃদ্ধির আবেদন করা হবে।
চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে ইনু উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আন্দোলন দমন ও গতিপথ পরিবর্তনের লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের ‘বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষে তিনি অবস্থান নেন। ইনু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্ররোচনা ও উস্কানি দিয়েছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারদের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে তিনি বৈধতা দিয়েছিলেন। বিচারে এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত হয়। কারফিউ কার্যকরের অংশ হিসেবে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশনা এবং বিএনপি-জামায়াতকে নির্মূল করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
তার ভাষ্য, ইনু একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’ আখ্যায়িত করেছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপেও ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন। সেই কথোপকথনে শেখ হাসিনা অতীতে ‘জঙ্গিদের’ ফাঁসি দেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে ইনু সমর্থন জানান। এবারও ‘জঙ্গি কার্ড’ ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। আন্দোলনকারীদের বিভক্ত করা ও বিএনপি-জামায়াতকে নির্মূল করার পরামর্শও দিয়েছিলেন।
চিফ প্রসিকিউটরের অভিযোগ, ইনু কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনার পর কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হন।
তিনি বলেন, ইনুর উস্কানিমূলক বক্তব্য ও ষড়যন্ত্রের ফলে সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতা নিহত। ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ নীতির আওতায় এই ঘটনার দায় যেমন শেখ হাসিনার ওপর বর্তায়, তেমনি হাসানুল হক ইনুর ওপরও বর্তায়।


