নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ১৩টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপিত ডিজিটাল ল্যাবের মধ্যে বর্তমানে কার্যক্রম চালু রয়েছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানে। বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠানের ল্যাব দীর্ঘদিন ধরে প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও তালাবদ্ধ কক্ষে ধুলো জমেছে, কোথাও জং ধরেছে তালায়। ফলে সরকারের দেওয়া প্রায় ২২৫টি কম্পিউটারের অধিকাংশই অকেজো হয়ে পড়েছে।
দেশে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা সম্প্রসারণ ও শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত দুই ধাপে এসব ল্যাব স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো হাতিয়ার ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ডিজিটাল ল্যাব, স্মার্ট টিভি ও স্মার্ট বোর্ড সরবরাহ করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, ল্যাব পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় স্থাপনের পর অল্প কিছুদিন ব্যবহারের পর অধিকাংশ ল্যাবই বন্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক স্থানে সেগুলো অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
সরেজমিনে হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে গিয়ে দেখা যায়, ডিজিটাল ল্যাব কক্ষের তালায় জং ধরেছে। কলেজের কর্মচারীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে কক্ষটি বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এইচ. এস. সাইফুল আলম ও সাবেক অধ্যক্ষ তোফায়েল হোসেন বলেন, কলেজে ১৭টি কম্পিউটার ও একটি স্মার্ট টিভি দেওয়া হলেও অপারেটর না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে এক দুইটি কম্পিউটার সচল থাকলেও অধিকাংশই অকেজো।
কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নজরুল ও ফয়সাল জানান, তারা কখনো ল্যাবরুম খোলা দেখেননি এবং সেখানে কোনো ক্লাসও হয়নি।
হাতিয়া শহর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সোহেল উদ্দিন বলেন, তাদের বিদ্যালয়ে পাঁচটি কম্পিউটার সচল রয়েছে। মাঝে মধ্যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হলেও অপারেটর পদ না থাকায় নিয়মিত কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে সুখচর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় ও আব্দুল মোতালেব উচ্চ বিদ্যালয়ে ডিজিটাল ল্যাব কার্যক্রম চালু রয়েছে। সরেজমিনে সেখানে প্রশিক্ষণ ও ক্লাস চলতে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির প্রধানরা জানান, পাঁচ থেকে ছয়টি কম্পিউটার সচল থাকলেও বাকিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।
আব্দুল মোতালেব উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানায়, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার শিক্ষক ও অপারেটর থাকায় তারা নিয়মিত ক্লাস ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে।
তবে হাতিয়া ডিগ্রি কলেজ, প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম মহিলা কলেজ, হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজ, কেএসএস সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রহমানিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, এমসিএস উচ্চ বিদ্যালয়, ছৈয়দিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, চৌমুহনী উচ্চ বিদ্যালয়, এসটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং আয়েশা ফেরদৌস উচ্চ বিদ্যালয়সহ মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব কার্যক্রম প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কতগুলো কম্পিউটার সচল বা অকেজো রয়েছে, সে তথ্যও কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে ১৭টি করে কম্পিউটার এবং একটি করে স্মার্ট টিভি সরবরাহ করা হয়েছিল। এছাড়া সুখচর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘স্কুল অব ফিউচার’ প্রকল্পের আওতায় অতিরিক্ত চারটি ডেস্কটপ কম্পিউটার ও ছয়টি স্মার্ট বোর্ড দেওয়া হয়। তৎকালীন বাজারমূল্যে এসব সরঞ্জামের মূল্য ছিল কোটি টাকারও বেশি।
ল্যাবগুলোর এ অবস্থার কারণে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের কোটি টাকার সম্পদ অবহেলায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে নোয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় আমাদের অফিসকে কিছু জানানো হয়নি। প্রকল্প পরিচালক যেভাবে পেরেছেন, সেভাবেই স্থাপন করেছেন। এগুলোর মনিটরিং কারা করছে, সেটিও আমাদের জানা নেই।’
এদিকে উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চল হাতিয়ার শিক্ষার্থীদের মধ্যে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন উত্থাপন করেন নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ।
জবাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’-এর আওতায় হাতিয়া উপজেলায় এ পর্যন্ত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রকল্পের পরিধি বাড়িয়ে সারাদেশে আরও এক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, ‘১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাব স্থাপনের বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই।’
জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের হাতিয়া কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিলয় ভৌমিক বলেন, ‘এ সংক্রান্ত কোনো কাজের বিষয়ে আমাদের অধিদপ্তরের জানা নেই। কারা কাজটি করেছে, তাও জানা নেই।’
একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান জানান, সাবেক এক সংসদ সদস্যের প্যাডে আবেদন করার পর ঢাকা থেকে একটি দল এসে ল্যাব স্থাপন করে। তারা ১৭টি কম্পিউটার, একটি মাল্টি বোর্ড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে হস্তান্তর করে।
তবে প্রকল্পের ব্যয়, টেন্ডারের পরিমাণ কিংবা ঠিকাদার কারা ছিলেন, সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য জানেন না।


