পটুয়াখালীর ছোট বিঘাই ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ। গত এক সপ্তাহ ধরে তার দিনগুলো কাটছে হাসপাতালের বারান্দা, জরুরি বিভাগ আর বুকফাটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে।
তার শিশু কন্যা হুমায়রা প্রথমে সামান্য জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তার অবস্থা আশঙ্কাজনকভাবে খারাপ হতে শুরু করে। স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করার পরও চিকিৎসকরা তার রোগটি ঠিক কী, তা নিশ্চিত করতে পারছিলেন না।
ইউসুফ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রথমে ওর শুধু জ্বর ছিল। পরে মনে হলো জ্বরটা ওর মাথায় উঠে গেছে। আমরা ওকে পটুয়াখালী হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু চিকিৎসকরা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে এটা হাম নাকি নিউমোনিয়া।’
ইউসুফের এই চরম ভোগান্তি আসলে দেশের একটি নির্মম বাস্তব চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে আসা পরিবারগুলোর গল্পগুলো একদম একই রকম। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো সব রোগের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে সেখানকার চিকিৎসকদের কাছে জটিল শিশু রোগীদের রাজধানীতে পাঠানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না।
কিন্তু ঢাকা এসে হাসপাতালের একটি বেড খুঁজে পাওয়া যেন আরেক যুদ্ধ। নিরুপায় ও দিশেহারা বাবা-মায়েরা এক উপচে পড়া হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে কেবলই ছুটে বেড়ান।
এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। অনেককে তাদের কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। রাজধানীতে সন্তানের পাশে থাকার খরচ জোগাতে তারা বিপুল ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।
গ্রাম থেকে শহরে রোগী আসার এই চিত্রটি খুবই ভয়াবহ। রোববার ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল এবং ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৪ জন রোগীর মধ্যে মাত্র দুইজন ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা।
রোগী ও তাদের স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক উপজেলা এবং জেলা স্তরের হাসপাতালে হামের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ইউনিট বা ওয়ার্ড নেই। যেখানে অল্প কিছু ইউনিট আছে, সেগুলোও রোগীর অতিরিক্ত চাপে হিমশিম খাচ্ছে।
এর ফলে প্রায়ই রোগটি অনেক দেরিতে শনাক্ত হয়। আর রোগীদের অবস্থা যখন একেবারে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই তাদের পাঠানো হয় রাজধানীতে।
চিকিৎসকদের মতে, লক্ষণগুলো মারাত্মক রূপ নেওয়ার পর পরিবারগুলোর হাসপাতালে আসার এই সাধারণ প্রবণতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মো. মুশতাক হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বল কাঠামোর কারণেই ঢাকার ওপর এই ব্যাপক রোগীর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা যদি জরুরি ভিত্তিতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল, বেড, অক্সিজেন সহায়তা এবং শিশু জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে এই চাপ দিন দিন আরও বাড়বে।’
এই সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত সপ্তাহে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এবং শিশু বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছে। সেখানে রোগী রেফার করা এবং প্রশিক্ষণের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেলেও মাঠ পর্যায়ে তার দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো খুবই কম।
এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মইনুল আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ইউসুফের ক্লান্তি কেবলই বাড়ছে
পটুয়াখালী হাসপাতালে দীর্ঘ চার দিন যন্ত্রণার পর ইউসুফ তার শিশু কন্যাকে কোলে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু এই ক্লান্তিকর যাত্রা তার জন্য কোনো স্বস্তি বয়ে আনেনি।
তিনি যখন ঢাকা শিশু হাসপাতালে পৌঁছান, তখন তাকে জানানো হয় সেখানে কোনো বেড খালি নেই। এরপর শুরু হয় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে ফিরে আসার নির্মম অধ্যায়। শিশু হাসপাতাল থেকে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ইউসুফ সেই স্মৃতির কথা মনে করে বলেন, ‘আমি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গেলাম, কিন্তু তারা বলল সেখানে কোনো অক্সিজেন নেই। তারা আমাদের সরাসরি জানিয়ে দিল অক্সিজেন ছাড়া বাচ্চার কিছু হলে তারা কোনো দায় নিতে পারবে না।’
সব মিলিয়ে এই দিশেহারা বাবাকে রাজধানীর অন্তত পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন হাসপাতালে ঘুরতে হয়েছে।
তিনি ও তার স্ত্রী অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের রিসেপশন কাউন্টার থেকে শুরু করে ওপরের তলা পর্যন্ত আর সারা রাত শহরের রাস্তায় রাস্তায় হন্যে হয়ে ঘুরেছেন।
তিনি বলেন, ‘একটি কাউন্টার থেকে আমাকে অন্য তলায় যেতে বলা হলো। অন্য তলা থেকে আবার আরেক জায়গায় পাঠানো হলো। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে তখন মাঝরাত পার হয়ে গেছে।’
সময় যত গড়াচ্ছিল, তাদের উদ্বেগ ততটাই বাড়ছিল। অসুস্থ শিশুটি তখন ঠিকমতো মায়ের বুকের দুধও পান করতে পারছিল না।
ইউসুফ ভারী গলায় বলেন, ‘রাত দুইটার দিকে আমার ছোট মেয়েটা আর বুকের দুধও গিলতে পারছিল না। একজন বাবা-মার বুক যে তখন কতটা ভেঙে যায়, তা কেবল তারাই বোঝেন।’
হুমায়রা এখন অবশেষে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি আছে। পটুয়াখালীতে চার দিন কাটানোর পর এখানে গত আট দিন ধরে তার চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালের বিছানায় মেয়ের পাশে বসে থাকা ইউসুফের ক্লান্ত মুখে এই দীর্ঘ লড়াইয়ের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
হুমায়রার বয়স এক বছরের কম হওয়ায় সে এখনো হামের টিকা পাওয়ার উপযুক্ত বয়স পর্যন্ত পৌঁছায়নি। এরই মধ্যে তার এই অসুস্থতার কারণে পরিবারের ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে।
মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং করে জীবিকা নির্বাহ করা ইউসুফের জন্য এই টাকা জোগাড় করা ছিল পাহাড়সম এক চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এত টাকা ছিল না। নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আমাকে আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হাত পাততে হয়েছে। কৃতজ্ঞতা জানাই যে বিপদের সময় মানুষ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।’
ইউসুফ বারবার বলছিলেন যে পটুয়াখালীতে শিশুদের জন্য মৌলিক চিকিৎসা সুবিধা না থাকার কারণেই তিনি ঢাকা আসতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় হাসপাতালের করুণ অবস্থার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, সেখানে ওয়ার্ডগুলো এতটাই গাদাগাদি যে একটি বেডেই দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে।
ইউসুফ বলেন, ‘সেখানে বসে বাচ্চাকে খাওয়ানোর মতোও কোনো জায়গা নেই। পটুয়াখালীতে যদি সঠিক চিকিৎসা থাকত, তবে আমাদের কখনোই ঢাকা আসতে হতো না। আমরা এই বিপুল ঋণের সাগরে ডুবতাম না।’
ঋণের মধ্যে চিকিৎসার টাকা জোগানোর সংগ্রাম
ভোলার এক বাবা মিজানুর রহমানও একই রকম এক হাড়হিম করা অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন।
তিনি বর্তমানে তার ছয় মাস বয়সী মেয়ে আমেনাকে নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হাসপাতালে আছেন।
মিজানুর জানান, শিশুটির শরীরে ছোট ছোট দানা বা দাগ দেখা দেওয়ার মাধ্যমে এই অসুস্থতা শুরু হয় এবং এর পরপরই তীব্র জ্বর আসে। এই ফুসকুড়ি দেখেই পরিবার বুঝতে পারে যে এটি হাম। তারা যখন তাকে ভোলার একটি স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যান, তখন চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ, শিশুটির হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়াও দেখা দিয়েছিল।
মিজানুর মনে করে বলেন, ডাক্তার আমাদের বললেন, পরিস্থিতি খুবই জটিল, ওকে এখনই ঢাকায় নিয়ে যান। জ্বর যদি আরও বাড়ে তবে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই আমরা আর এক মুহূর্তও দেরি করিনি।’
ঢাকায় আসার পর থেকে মিজানুরের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসার পেছনে তিনি ইতিমধ্যে প্রায় ২৩ হাজার টাকা খরচ করে ফেলেছেন। এই বিপুল পরিমাণ টাকা তিনি কেবল তার সহকর্মী এবং কর্মক্ষেত্রের ঠিকাদারদের কাছে আর্থিক সাহায্য চেয়ে জোগাড় করতে পেরেছেন।
মিজানুর বলেন, ‘এটা আমার জন্য অসম্ভব কষ্টের। এটা অনেক বড় অঙ্কের টাকা। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য শুধু ঢাকায় আসাই এক বিশাল মানসিক চাপ। কোথা থেকে টাকা পাব আর পরবর্তীতে কী করব, এই ভয় আমাদের সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়।’
আমেনার বয়স মাত্র ছয় মাস হওয়ায় সেও এখনো নিয়মিত হামের টিকা নেওয়ার মতো বড় হয়নি।
কয়েকটি বেড পরেই যশোরের আবদুল্লাহ আল ফজল রাজিও ঠিক একই রকম এক লড়াই লড়ছেন। তার মেয়েরও একসাথে হাম ও নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে। তিনি যখন প্রথমে তাকে যশোর শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান, তখন তার অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাচ্ছিল। কিন্তু স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা পাঠানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। রাজধানীতে এসে ফজল নিজেকে চরম আতঙ্ক ও বিভ্রান্তির মধ্যে আবিষ্কার করেন।
তিনি বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওকে ভর্তি করার মতো একটা বেডও খালি ছিল না।’
অবশেষে তিনি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে একটি জায়গা নিশ্চিত করতে সক্ষম হন। তার মেয়ে এখন চিকিৎসা পেলেও এই ১০ থেকে ১১ দিনের হাসপাতালে থাকার কারণে তার ইতিমধ্যে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে।
মিজানুরের মতো ফজলেরও আয় পুরোপুরি বন্ধ। মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে তাকে এখন ধারের টাকার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। রাজি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, জেলা পর্যায়ে যদি শিশুদের ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকত, তবে তার পরিবারকে এই মানসিক ট্রমা এবং ঢাকা আসার আর্থিক ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে হতো না।
প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর মিছিলও দীর্ঘ হচ্ছে
পরিবারগুলো যখন চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন দেশজুড়ে হামের প্রকোপে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামজনিত লক্ষণে আরও ছয়টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এই নতুন মৃত্যুর ফলে গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৯ জনে। এই মৃত্যুর মধ্যে ২০০টি ঘটেছে ঢাকায়। রাজধানীর ভেতরে স্থানীয়ভাবে এই রোগ ছড়ানোর হার তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ জেলা থেকে গুরুতর ও নথিপত্রহীন রোগীদের এই ব্যাপক আগমনের কারণেই ঢাকায় মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি।
চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এই চাপ এখনো অত্যন্ত তীব্র। একই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশব্যাপী আরও ১ হাজার ৬৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৯২ জনে।


