মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের ইস্টার্ন গ্যালারিতে বিশাল এক ব্যানার টানানো। স্বর্ণালি হরফে লেখা মুশফিকুর রহিমের কীর্তি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে খেলতে নেমেছেন শততম টেস্ট। ব্যানারে বসানো ছবিটাও দারুণ, মাথায় রঙচটা টেস্ট ক্যাপ, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উল্লাসে মাতোয়ারা। সেটা তার তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরির ছবি।
বুধবার পুরো দিন জুড়ে রোদ পড়েছে ব্যানারটার ওপর। বেলা যত গড়িয়েছে, কমেছে সূর্যের তাপ, তবে বেড়েছে ব্যানারটার ঔজ্জ্বল্য। ঠিক যেন মুশফিকের ক্যারিয়ারের মতো। শততম টেস্টের বিশাল এই উপলক্ষ্যটা মুশফিক রাঙিয়ে ফেলতে পারতেন দারুণ এক সেঞ্চুরিতে। কিন্তু দিনের পুরো ৯০ ওভার খেলা হয়ে যাওয়াতে, ৯৯* রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি।
সেঞ্চুরি না পেলেও ক্যারিয়ারজুড়ে টেস্ট ক্রিকেটটা যেভাবে খেলেছেন, ধীর-স্থিরভাবে যে ঢংয়ে পুরো ক্যারিয়ারটা সাজিয়েছেন, এই ইনিংসেও ছিল তারই ছাপ। তার দৃঢ় এই ইনিংসের সাথে মুমিনল হকের ৬৮ ও লিটন দাসের ৪৭* রানের ইনিংসে ৪ উইকেটে ২৯২ রান তুলে প্রথম দিনের খেলা শেষ করেছে বাংলাদেশ।
১৪৭ বছরের ইতিহাসে ১০০ বা ততোধিক টেস্ট খেলা ক্রিকেটারের সংখ্যা বুধবার সকাল পর্যন্তও ছিল ৭৮। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত টস করার পরপর এই তালিকায় যুক্ত হলেন মুশফিক। ১০০ টেস্ট খেলা এই এলিট ক্লাবের ১১জন ক্রিকেটারের কীর্তি ছিল শততম টেস্টে সেঞ্চুরির। এই ইনিংসে মুশফিক আর একটা রান করে ফেলতে পারলে এই তালিকার ১২-তম আর বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হতেন সেটা বলাই বাহুল্য।
ব্যাটিংয়ে নামার আগে পেয়েছেন বিসিবির বিশেষ সংবর্ধনা। অভিষেক টেস্টে আর শততম টেস্টের সতীর্থদের কাছ থেকে উপহার পেয়েছেন তাদের স্বাক্ষর করা বিশেষ জার্সি। অভিষেক টেস্টের অধিনায়ক হাবিবুল বাশার তুলে দিয়েছেন বিশেষ ক্যাপ। উপস্থিত ছিলেন ২০০৫-এর সেই লর্ডস টেস্টের সতীর্থরাও। দারুণ এই স্মৃতি নিয়ে যখন চিরচেনা পাঁচ নম্বর পজিশনে ব্যাটিংয়ে নামেন, তখন ৯৫ রানে তৃতীয় উইকেটটা পড়েছে বাংলাদেশের।
ঠিক তার পুরো ক্যারিয়ারেরই প্রতিচ্ছবি যেন, বিশেষত টেস্টে যতবার বাংলাদেশ দল বিপদে পড়েছে, ততবারই ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার। ২৮ তম ওভারে এসেছিলেন উইকেটে, মাঠ ছেড়েছেন তৃতীয় সেশনের খেলা শেষ করে। দিনের পড়ন্ত আলোর সবটুকু নিজের সঙ্গী করে। ৬৮ নম্বর বলে মেরেছেন নিজের প্রথম বাউন্ডারি। টি ব্রেক থেকে ফিরে দুর্দান্ত এক কভার ড্রাইভে চার মেরে ছুঁয়েছেন ২৮তম ফিফটি। ১৮৭ বলের ইনিংসে মেরেছেন পাঁচটা চার, লিটন দাসের সাথে গড়েছেন ৯০* রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি।
মুশফিকের ঐতিহাসিক এই অর্জনের দিনে শুরুটা ভালো হলেও ম্যাকব্রাইনের স্পিন জাদুতে প্রথম সেশনে খেই হারিয়েছে বাংলাদেশ। ৩১ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে ১০০ রান তুলে লাঞ্চ ব্রেকে যান মুশফিক ও মুমিনুল। অবশ্য শুরুর সেই ধাক্কা এই দুজনের ২১৪ বলে ১০৭ রানে জুটিতে সামলে ওঠে বাংলাদেশ। তবে ব্যক্তিগত ৬৮ রানে ম্যাকব্রাইনের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছেন মুমিনুল।
সকালের সেশনের শুরু থেকেই বড়সড় সব বাউন্স দেখা গেছে উইকেটে, যেখানে আছে টাটকা ঘাসের ছোঁয়াও। যদিও দুই ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়-সাদমান ইসলাম সেসবের সাথে মানিয়ে নিয়ে খেলেছেন দারুণ সব শট। ফুল লেন্থ বলে কভার ড্রাইভ, শর্টার লেন্থ থেকে লাফিয়ে ওঠা বলে স্কয়ার কাট খেলেছেন অনায়াসে। ওপেনিংয়ে গড়েছেন ৫২ রানের জুটি। অবশ্য অফস্পিনার ম্যাক ব্রাইনের বলের টার্নে লাইন মিস করে এলবিডব্লিউ হয়েছেন সাদমান। ছয়টি চারে ৪৪ বলে করেছেন ৩৫ রান।
সিলেট টেস্টে সেঞ্চুরি করা জয় বেশ দেখেশুনেই খেলছিলেন। ৮৬ বলের ইনিংসে চার মেরেছেন মাত্র দুটো। সেটাই কিনা শেষ পর্যন্ত কাল হলো তার জন্য। ম্যাকব্রাইনের টসড আপ ডেলিভারিকে এগিয়ে এসে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন বদলি ফিল্ডার ব্যারি ম্যাকার্থির হাতে। ৩৪ রান করেছেন এই ডানহাতি ওপেনার। অধিনায়ক শান্ত আউট হওয়ার এক বল আগেই লং অন দিয়ে বেশ দারুণ একটা ছক্কা মেরেছিলেন ম্যাকব্রাইনকে। কিন্তু পরের বলের লেন্থটা কমিয়ে আনায়, টার্নের সাথে আর মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি। ১১ বলে ৮ রান বোল্ড হয়েছেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।


