মুহাম্মদ ইউনুস প্রশাসনের সময় ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট) আইনি ভিত্তি এখন গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (আইইইপিএ)–এর অধীনে আরোপিত সার্বিক শুল্ক বাতিল করেছে। ইতিমধ্যে ওই শুল্ক পরিশোধ করা আমদানিকারকদের প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের আইনি ধাক্কা। আর বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই চুক্তি কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হয়নি। বরং একটি তাৎক্ষণিক, কঠোর ও সর্বগ্রাসী শুল্ক আরোপের হুমকির মধ্যে এটি করা হয়েছিল।
এখন সেই হুমকির ভিত্তি যদি আদালত বেআইনি বলে ঘোষণা করে, তাহলে প্রশ্নটি আর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ভেঙে পড়া আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে করা এই চুক্তি বাংলাদেশ কেন মেনে চলবে।
এটি কোনো ছোটখাটো ত্রুটি নয়। বরং চুক্তির রাজনৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। চুক্তিতে শুল্ক কাঠামো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশে তৈরি পারস্পরিক শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সহজভাবে বললে, বাংলাদেশ এমন একটি শুল্ক শাস্তি এড়াতে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে, যার আইনি ভিত্তি আদালত টিকিয়ে রাখেনি। আরও উদ্বেগজনক হলো, চুক্তির ভাষায় এমন সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতেও চাপ প্রয়োগ করা যায়।
ফলে বিষয়টি আপত্তিকর হয়ে ওঠে। এক হুমকির মুখে বাংলাদেশকে ছাড় দিতে বাধ্য করা হয়েছে, আবার সেই হুমকি দুর্বল হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখার পথ রাখা হয়েছে।
এতে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি চাপ প্রয়োগের উপায় হারায়নি। তারা ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ এবং ১৯৬২ সালের ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্টের সেকশন ২৩২–এর মতো অন্য আইনি পথ বিবেচনা করছে।
তবে এগুলো ভিন্ন প্রক্রিয়া ও শর্তের আওতায় পড়ে। আইইইপিএ–এর মতো তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা এসব আইনে নেই। সেকশন ৩০১–এর ক্ষেত্রে অন্যায্য বাণিজ্য চর্চার প্রমাণ দিতে হয়, আর সেকশন ২৩২–এর ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন আসে।
এগুলো চাপ সৃষ্টির উপায় হলেও তুলনামূলকভাবে ধীর, সীমিত এবং চ্যালেঞ্জযোগ্য। ফলে আগের মতো ‘অপরিহার্য’ শুল্ক হুমকির ধারণা এখন আর টেকসই নয়।
এই পরিস্থিতিতে পুরো চুক্তিটি নতুন করে মূল্যায়ন করার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণও আছে। মালয়েশিয়া ইতিমধ্যে একই ধরনের চুক্তিকে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বাতিল ঘোষণা করেছে।
কুয়ালালামপুর বুঝেছে, চাপ প্রয়োগের আইনি ভিত্তি ভেঙে পড়লে সেই চুক্তিকে আর অটুট ধরা যায় না। তাহলে একই বাস্তবতায় বাংলাদেশ কেন সেই কাঠামোর মধ্যে থাকবে, সেই প্রশ্নও উঠে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি চুক্তি আলোচনায় ও স্বাক্ষরে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি চুক্তিটিকে দেশের স্বার্থ রক্ষাকারী বলে দাবি করেন এবং তড়িঘড়ি করে করা হয়নি বলে জানান।
এতে একটি সমস্যা তৈরি হয়। যিনি চুক্তির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, তিনিই যদি পুনঃআলোচনায় থাকেন, তাহলে বাস্তব পুনর্মূল্যায়নের বদলে আগের অবস্থান রক্ষার চেষ্টা হতে পারে।
এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই চুক্তি কোনো সীমিত শুল্ক সমন্বয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সরকারি ক্রয়, মানদণ্ড, কৌশলগত অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার কাঠামোর মতো বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
চুক্তিটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেন এটি অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানোর জন্য একটি প্রয়োজনীয় মূল্য। কিন্তু যদি সেই জরুরি পরিস্থিতি তৈরির জন্য ব্যবহৃত শুল্ক হুমকিই আদালতের কাছে অবৈধ প্রমাণিত হয়, তাহলে এই চুক্তির পক্ষে যুক্তি দেওয়ার দায় আবার তাদের ওপরই ফিরে আসে, যারা এটি করেছেন।
এখন তাদের ব্যাখ্যা করতে হবে, কেন বাংলাদেশ এমন অসম শর্তে আবদ্ধ থাকবে, যখন ওই ছাড় আদায়ের জন্য যে চাপ তৈরি করা হয়েছিল, সেটির ভিত্তিই সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছে।
তাদের আরও ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন দেশটি এমন ব্যক্তিদের সিদ্ধান্তে আস্থা রাখবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের আইনি সীমালঙ্ঘনকে একটি অনিবার্য ও অটল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। ওয়াশিংটনের এখনো প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা আছে এবং তারা অন্যান্য আইনের মাধ্যমে সেই প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করবে।
কিন্তু সেটি এই কথা বলার সমান নয় যে বাংলাদেশের কোনো বিকল্প ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র এখনো চাপ প্রয়োগ করতে পারে, তবে আগের মতো সহজে এই চুক্তিকে একটি তাৎক্ষণিক ও সর্বব্যাপী শুল্ক আক্রমণ এড়ানোর একমাত্র পথ হিসেবে দেখাতে পারবে না।
এই পার্থক্যটি স্পষ্ট হলে আগের সেই ‘কোনো উপায় ছিল না’ ধরনের ধারণা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তখন যা থাকে, তা কোনো অনিবার্য সমঝোতা নয়; বরং একটি গভীরভাবে অসম চুক্তি, যার পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা আর প্রয়োজনীয়তার যুক্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থান আড়াল করতে পারবেন না।
সুতরাং, বাংলাদেশের উচিত এই চুক্তিকে অবশ্যম্ভাবী কিছু হিসেবে দেখা বন্ধ করা। সরকার চাইলে পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত করতে পারে, অথবা আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে গিয়ে ব্যাপক পুনর্বিবেচনার দাবি তুলতে পারে।
আর যদি যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের ছাড় আবার চাই, তাহলে সেটি এবার কোনো বেআইনি জরুরি শুল্কের হুমকি ছাড়া যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।
এতে হয়তো পুরোপুরি ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে না। তবে অন্তত সেই ভ্রান্ত ধারণাটি দূর হবে, যার আড়ালে এই চুক্তি প্রথমে উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং যার সুযোগে অযৌক্তিক ধারাগুলো যুক্ত করা হয়েছিল।


