প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আদেশের পর দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হাওরে ফসলহারা কৃষক এখনও সরকার ঘোষিত সহায়তা পায়নি। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সঠিকভাবে যাচাইবাছাই করতে গিয়ে দেরি হচ্ছে।
তবে এরই মধ্যেই তালিকায় নানা অসঙ্গতির তথ্য সামনে আসছে। টাইমস অব বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যে তালিকা পেয়েছে তাতে দেখা যায়, সেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বজন, অকৃষিজীবী, সরকারি চাকরিজীবী, পোশাক কারখানার কর্মী এমনকি মৃত মানুষের নাম আছে। যাদের তালিকা করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা পরিবারের একাধিক সদস্যকে তালিকাভুক্ত করে নিয়েছেন।
ফসলহানির ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায় সরকার ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ ক্যাটাগরি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণও কম বেশি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, এমন অনেক মানুষের নাম ‘ক’ শ্রেণিতেও দেখা যাচ্ছে।
সিলেট বিভাগের চার জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় দিতে ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৯ জন কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। তারমধ্যে সিলেট জেলায় ৪ হাজার ৭৪৫ জন, সুনামগঞ্জে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৩১ জন, হবিগঞ্জে ২৭ হাজার ৬০৬ জন ও মৌলভীবাজারে ২৫ হাজার ২৯৭ জন।
সবচেয়ে বেশি অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠেছে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায়। সেখানে তালিকা যাচাই বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ কৃষকদের। এর বাইরে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সুপারিশ-তদবিরেও তালিকায় নাম ঢোকানো হয়েছে।
তালিকা প্রণয়নকারীরা বলছেন, তালিকা প্রস্তুতে মাত্র এক থেকে দু’দিন সময় দেওয়ায় এবং একাধিক মাধ্যম থেকে কৃষকের নাম যাওয়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে।
এপ্রিলের শেষে ফসল হারানো কৃষকদেরকে সহায়তা দিতে সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয় প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। এরপর ৭ মে সন্ধ্যায় সচিবালয়ে এক সভায় দ্রুত পদক্ষেপ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে তালিকা করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে যে তালিকা তৈরি হয়েছে, তাতে কয়েকটি ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যরা নিজেদের পরিবারের ৭ থেকে ৮ জন সদস্যদের নামও অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায়ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিনিময়ে ‘গ’ শ্রেণির কৃষককে ‘ক’ শ্রেণির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও করছেন কৃষকরা।
শাল্লা উপজেলার বাহারা ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য দেবব্রত সরকারের পরিবারের ৭ সদস্যের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
অথচ উপজেলার পোড়ারপাড় গ্রামের প্রায় ৩০টি পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এই তালিকার বাইরে রয়েছে।
দেবব্রত দাসের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
৫ নম্বর ওয়ার্ডে তালিকার ৩২৫ নম্বর ক্রমিকের অখিল চন্দ্র চৌধুরী ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরীর আপন চাচা। তিনি ঢাকায় থাকেন, হাওরে তার কোনো জমি নেই।
১১৬ নম্বর ক্রমিকের জিপেশ সুত্রধরও ঢাকায় থাকেন। হাওরে তিনি কোনো জমি চাষ করেননি। ১০৭ নম্বর ক্রমিকে আছেন জিপেশ সুত্রধরের আপন ভাই। ২৮৮ নম্বর ক্রমিকের মনমোহন চৌধুরী ইউপি সদস্যের বাবা। তিনি গত ৫ মাস ধরে ঢাকায় মেয়ের বাসায় রয়েছেন।
ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী হাওরে ৫ বিঘা জমি চাষ করলেও বৃষ্টির আগেই সব ফসল কেটে ঘরে তোলেন। তার ফসলের কোনো ক্ষতি না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় ২৮৬ নম্বর ক্রমিকে রয়েছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কৃষক জানান, তিনি ২০ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। এর মধ্যে ৮ বিঘা জমির ধান কাটা হয়েছে। এত ক্ষতি হওয়ার পরও তিনি তালিকায় পড়েননি।
জানতে চাইলে মিহির চৌধুরী বলেন, “আমার তালিকা অন্যরা করেছেন। তালিকায় কিছু মৃত ব্যক্তির নাম আসতে পারে। এগুলো বাদ দেওয়ার বিষয়ে পরিষদে আলোচনা হয়েছে।”
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, “তালিকায় মৃত ব্যক্তি বা অযোগ্য কারও নাম পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দিরাই উপজেলার তালিকা প্রস্তুত করা হলেও এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। তবে এ তালিকায়ও অনিয়ম থাকতে পারে বলে মেনে নিয়েছেন তাড়ল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী আহমদ। তিনি বলেন, “তালিকা করতে মাত্র একদিনের সময় দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন মাধ্যম থেকে কৃষকদের নাম নেওয়া হয়েছে। এ কারণে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নাম আসতে পারে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিব সরকার বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তালিকায় অযোগ্য কেউ থাকলে সেটি পুনরায় যাচাই-বাছাই করা হবে।”
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, “যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অকৃষকের নাম পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে তা বাদ দেওয়া হবে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, “কেউ যদি অনিয়ম করে অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম দিয়েও থাকে, উপজেলা পর্যায়ে সেটি যাচাই-বাছাই করার কথা। কিন্তু সেটি না করা হয়ে থাকলেও সংশ্লিষ্টদের উপরই বর্তায়।”
ঈদের আগেই সহায়তা দাবি
এদিকে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কিশোরগঞ্জের হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। এর মধ্যে দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদ। ঈদ সামনে রেখে সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় দিন গুনছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
অষ্টগ্রাম উপজেলার কলমা গ্রামের কৃষক সুমিত্র দাস বলেন, “এলাকার মেম্বার সাহেব নাম লিখে নিছে। কইছে সরকার আমরারে সাহায্য দিবো। মনে করছিলাম খুব তাড়াতাড়ি সহায়তা পাইমু। কিন্তু অহন পর্যন্ত বুঝতাছি না, কবে পাইমু।”
খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের কৃষক হাফিজুল ইসলাম বলেন, “ঈদের বাকি মাত্র আর কয়েকদিন। সরকারি সাহায্যটা ঈদের আগে পেলে অনেক ভালো হতো। বউ-পোলাপান নিয়ে ঈদটা ভালো কাটত।”
মিঠামইন উপজেলার ঢাকী ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের কৃষক মনির মিয়া বলেন, “তিন একর জমি করছিলাম। প্রথমে ক্ষতি করছে শিলাবৃষ্টি। পরে যেইটুকু ভালো আছিন হেইডি নিলোগা পানিতে। কোনো রকম যেডি কাইট্টা আনছিলাম হেইডিও নষ্ট অইছে খলাত থাইক্যা। সারাটা বছর কেমনে চলমু বুঝতাছি না। সরকারি সহায়তাডা ঈদের আগে পাইলে ভালো হইতো।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে জেলায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৫৩ হাজার ছাড়িয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জানান, চলতি মাসের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে সরকারি সহায়তা বিতরণ করা হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত ৭৭ হাজার, তালিকায় নাম ৫৪ হাজার
নেত্রকোণায় ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষকের নাম তালিকায় উঠেনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কৃষকের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৩৬৩। ১৬ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৬৫ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে, টাকার হিসাবে ক্ষতি ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
তবে জেলা ত্রাণ ও পূর্নবাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন যে হিসাব দিয়েছেন, তাতে নাম উঠেছে ৫৭ হাজার ৪১৩ জনের। এদের মধ্যে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ১৯ হাজার ১৬৯ জনকে ‘ক’ শ্রেণিতে, ২৭ হাজার ৯৮৩ জন ‘খ’ শ্রেণিতে, এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ১০ হাজার ২৬১ জন।
মোহনগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর ভাটিয়া গ্রামের কৃষক মানিক তালুকদার জানান, ধান তলিয়ে যাওয়ার পর খড় সংকটে তিনি কয়েকটি গরু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
কৃষক শফিকুল ইসলামও একই কাজ করেছেন। বলেছেন, নিজেদের খোরাক জোগানো নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
গোখাদ্য সংকটের কারণে হাওরাঞ্চলে খড়ের দাম ও চাহিদা বেড়েছে। মোহনগঞ্জের খামার মালিক মো. দিলাল মিয়া জানান, প্রতি কাঠা জমির খড় কিনতে তার ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। আগে এর জন্য ব্যয় হতো ৫০০-৬০০ টাকা।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, বৃষ্টির পানিতে ৩ হাজার ৩০৫ টন খড় নষ্ট হয়েছে। কাচাঁ ঘাস নষ্ট হয়েছে ১০৩ টন। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক ও খামারিদের মাঝে পশু খাদ্য বিতরণে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন কিশোরগঞ্জের রাকিবুল হাসান রোকেল ও নেত্রকোণার ভজন দাস)


