কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক নৌ-ডাকাতির ঘটনায় জনমনে তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। করিমগঞ্জ, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন নৌপথে নিয়মিত বিরতিতে লাশবাহী নৌকা, গরু ব্যবসায়ী, হাঁস ব্যবসায়ী ও পর্যটকবাহী ট্রলারে ডাকাতি হচ্ছে। প্রশাসন নৌপথে টহল বাড়ালেও সন্ধ্যার পর নৌযান চলাচলে নিরুৎসাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতভেদ তৈরি হয়েছে।
৭ জুলাই রাতে করিমগঞ্জের সুতারপাড়া হাওরের নোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় ১৫ দিনের এক শিশুর মরদেহবাহী নৌকায় হামলা চালায় মুখোশধারী ডাকাতদল। তারা অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে মোবাইল ফোন, সোলার ব্যাটারি ও নগদ টাকা লুটে নেয়। এ অমানবিক ঘটনা জেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এর পরদিন ৮ জুলাই সন্ধ্যায় মিঠামইন হাওরে তিন গরু ব্যবসায়ীর নৌকায় ডাকাতি হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ডাকাতরা তাদের মারধর করে সাড়ে ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। একইদিন সন্ধ্যায় ইটনার বর্শিকুড়া-শেরপুর সেতুসংলগ্ন এলাকায় হাঁস ব্যবসায়ীদের নৌকায় ডাকাতি হয়। এ সময় নগদ ৭৫ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন ও নৌকার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম লুট করা হয়।
এর আগে ৭ জুন রাতে মিঠামইন-করিমগঞ্জ সীমান্তের হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় ৪০ জন পর্যটকবাহী ট্রলারে ডাকাতি হয়। পর্যটকদের জিম্মি করে মোবাইল, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুটে নেয় ডাকাতরা।
ইটনার ছিলনী গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল মিয়া জানান, প্রায় প্রতিদিন গ্রামের পাশের চরের বিলে ডাকাতদের ঘোরাফেরা দেখা যায়। গ্রামবাসী পালাক্রমে পাহারা দেওয়ায় তারা বাড়িতে উঠতে পারে না। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে দিয়ে ডাকাত ঘুরতেছে, ভয়ে কিছুই করতে পারছি না।’ বর্তমানে গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় পাহারাদার নিয়োগ করা হয়েছে।
মিঠামইনের গোপদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক বাচ্চু জানান, আগে রাতে চলাচলে ভয় ছিল না। এখন সন্ধ্যার আগেই গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের মতো ব্যস্ত জায়গায় দিনের আলোতে ডাকাতি কল্পনাও করা যায় না। বিভিন্ন গ্রামের কিছু মানুষ ডাকাতদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে।’
করিমগঞ্জের নৌকার মাঝি হাবিকুল ইসলাম জানান, আগে বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা হাওরে এসে রাত কাটাতেন। এখন সন্ধ্যার আগেই সবাই ফিরে যান। তার ভাষ্য, ‘এখন তো অন্ধকারও লাগে না, দিনের আলোতেই ডাকাতেরা হামলা চালায়।’
ডাকাতি বাড়লে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ডাকাতপ্রবণ জলপথে বিশেষ নৌ-টহল শুরু করেছেন। জেলা পুলিশ বিকেল সাড়ে ৫টার পর জরুরি কারণ ছাড়া নৌপথে চলাচল না করার পরামর্শ দিয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, এক মাস আগের ডাকাতির ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ডাকাতি প্রতিরোধে বালিখলা ফেরিঘাট, নিকলী বেড়িবাঁধ এবং ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কে তিনটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
১২ জুলাই জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম জানান, হাওরের ডাকাতি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। প্রশাসনের কাছে ডাকাতদের তালিকা রয়েছে। পুরোনো রেকর্ডের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান চালালে ডাকাতরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান নৌযান চলাচলের সময়সীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত এটি। হাওরবাসীর প্রয়োজনে গভীর রাত পর্যন্ত নৌযান চলাচল করতে হয়। তাই এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’
তিনি জানান, এলাকায় গিয়ে জনবল নিয়ে ডাকাতদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম থানার জন্য তিনটি দ্রুতগামী স্পিডবোট বরাদ্দের দাবি জানান তিনি। তার মতে, ডাকাতরা দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করে, তাই তাদের মোকাবিলায় পুলিশের আধুনিক জলযান থাকা প্রয়োজন।
লাশবাহী নৌকায় ডাকাতির শিকার আবদুল হক জানান, মিঠামইনের চমকপুর গ্রামের ওই শিশুটি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। মরদেহ নিয়ে ফেরার পথে করিমগঞ্জের বালিখলা ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ার ১৫ মিনিট পর ছয় সদস্যের ডাকাতদল তাদের গতিরোধ করে। অনেক অনুরোধ করলেও ডাকাতরা কোনো কর্ণপাত করেনি।
একই নৌকায় থাকা দুলেনা বেগম বলেন, ‘বড় বড় নৌকা, লঞ্চ কিংবা গাড়িতে ডাকাতির কথা শুনেছি। কিন্তু লাশবাহী নৌকায়ও ডাকাতি হতে পারে, তা কখনো কল্পনা করিনি।’ নৌকার মাঝি রতন মিয়া জানান, ডাকাতরা সোলার প্যানেলের ব্যাটারি ও চার হাজার টাকা লুটে নেয়। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলেই তারা মারতে উদ্যত হয়।
ইটনার ছিলনী গ্রামে মসজিদের মাইকে ডাকাতদের উপস্থিতি ঘোষণা করায় মুয়াজ্জিন আবদুল মতিনকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। গ্রামবাসীর অনুরোধে তিনি ঘোষণা দিলে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। তবে স্থানীয় জেলে ফরিদ উদ্দিনের মাধ্যমে ডাকাতরা হুমকি দেয়, ‘এই মসজিদের মুয়াজ্জিনকে যেখানে পাব, তার খবর আছে।’
আবদুল মতিন বলেন, ‘মানুষের প্রয়োজনে ঘোষণা দিই। এখন সেই দায়িত্ব পালন করায় ডাকাতদের হুমকি শুনতে হচ্ছে, তাহলে আমরা কোথায় যাব।’


