সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান (এম আর হাসান) পদত্যাগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তদন্ত চলছিল।
আদালত সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান তার পদত্যাগপত্র সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছে জমা দেন, যা অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে গত ২৪ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক। আবেদনে রেজাউল হাসানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও চাওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১০ ও ২০১১ সালের দুটি কোম্পানি মামলার কার্যধারায় বিচারপতি হাসান পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছেন। একটি মামলায় সংশ্লিষ্ট সিনিয়র আইনজীবী উপস্থিত না থাকলেও রায়ে তার যুক্তিতর্ক উল্লেখ করা হয়, যা পরে আপিল বিভাগ বাতিল করে। অন্য মামলায় আবেদনকারীর স্ত্রীকে পক্ষভুক্ত না করেই তার ১৩ লাখ শেয়ার বাতিল করা হয়, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া আবেদনে বিচারপতি ও তার নিকটাত্মীয়দের সম্পদের পরিমাণ ঘোষিত আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। সম্পদ, যানবাহন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও কর নথির তুলনামূলক বিশ্লেষণে এ অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া আবেদনে বিচারপতি হাসানের পরিবারের বিরুদ্ধে পূর্বের কিছু বিতর্কিত ঘটনা তুলে ধরা হয়, যা বিচারকের আচরণগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। এর মধ্যে তার ছেলের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে দুর্ঘটনা, ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপ প্রয়োগ এবং ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি মিডিয়ায় অভিযুক্ত হিসেবে তার নাম প্রকাশেও বাধাদানের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বিচারপতি রেজাউল সরকারি দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত সফরের সময় টোল প্লাজায় টোল দিতে অস্বীকার করায় দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার অপ্রীতিকর ঘটনার সংবাদ দেশের প্রধান মিডিয়াগুলো প্রচার করেছে, যা স্পষ্টতই তার পদবীর কঠোর অবমাননা।
বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান ২০০৯ সালের জুনে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২০১১ সালের ৬ জুন স্থায়ী বিচারক হিসেবে শপথ নেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আপিল বিভাগের এক রায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল করা হয়। এর ফলে বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি জাতীয় সংসদের পরিবর্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে প্রত্যাবর্তন করে।
বিচারপতিদের অপসারণের এই ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে নিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী এনেছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে। ২০১৭ সালে রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
সেই আবেদন পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর রায় দেয়।
এর ফলে কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের সই করা পত্র পাঠিয়ে বিচারক নিজেও পদত্যাগ করতে পারেন।
প্রধান বিচারপতি ও পরবর্তী দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হয়।


