যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে ইরানকে অনুরোধ জানাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সরকার।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রকে সুবিধা না দেওয়া চীনের জন্য শাপে বর হিসেবে কাজ করছে। ফলে ট্রাম্পের অনুরোধ বেইজিং এই মুহূর্তে আমলে নিচ্ছে না।
তবে ট্রাম্পের আহবানে সাড়া না দেওয়ায় তার নির্ধারিত বেইজিং সফরে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে ন্যাটোর সমর্থন বাগাতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতে চীনের কাছে সহযোগিতা চাইছেন ট্রাম্প। তা ছাড়া, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ প্রশমন করতে হলেও তার বেজিং সফর গুরুত্বপূর্ণ। এমন সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ট্রাম্প প্রসাশনের জন্য কোনো সুখের খবর দিচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এরইমধ্যে তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকাবাহী জ্বালানিবাহী জাহাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো সেগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করায় ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বেড়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মার্কিন-চীন সম্পর্ক বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা আলি ওয়াইন বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলমান অবস্থায়ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শীর্ষ বৈঠক এক মাস পরে হলেও আয়োজন করতে ট্রাম্পের অনুরোধই দেখাচ্ছে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে অপারেশন এপিক ফিউরির ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে আগে ধারণা করতে পারেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন কূটনৈতিক ব্যর্থতায় হরমুজ প্রণালী একা খুলতে না পারায় ওয়াশিংটন এখন তাদের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী বেইজিংয়ের সাহায্য চাইছে।’

এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে বলেছে, ‘সব পক্ষেরই অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা, পরিস্থিতি আরও উত্তেজিত না করা এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব না ফেলার জন্য কাজ করা উচিত।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী খোলার অনুরোধ চীনের জন্য এখন কম জরুরি বিষয়। বরং চীনা কূটনীতিকরা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে চীন তাদের ইরানের প্রতি সমর্থনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তারই ধারাবাহিকতায় গত রোববার চীন ইরানের মিনাবে শাজারাহ তাইয়েবা প্রাথমিক বিদ্যালয় বোমা হামলায় নিহত শিশু ও শিক্ষকদের পরিবারের জন্য দুই লাখ ডলার জরুরি মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে।
এমনকি মার্চের শেষে ট্রাম্পের নির্ধারিত চীন সফর সম্পর্কে বেইজিং কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করেনি। অবশ্য সম্প্রতি ট্রাম্পের অনুরোধ আমলে নিয়ে তারা সফর পেছানো ও পুনঃনির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক বলে জানিয়েছে বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক কনসালট্যান্সি এশিয়া গ্রুপের ব্রেট ফেটারলির মতে, সফর বিলম্বিত হলে তা ট্রাম্প প্রশাসন ও চীন দুই পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক। তিনি বলেন, ‘বহির্বিশ্বের কোনো দেশে সামরিক অভিযান চলাকালে রাষ্ট্রপ্রধানকে বিদেশে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন।’
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সেনা ও সামরিক সামগ্রী স্থানান্তর, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে দক্ষ সেনাদের মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সার্বক্ষণিক মধ্যপ্রাচ্যে নজরদারির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ মধ্যপ্রাচ্যে জড়িয়ে থাকবে, চীন তা থেকে কৌশলগত সুবিধা নিতে পারবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের জন্য হয়তো বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই; যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের অবস্থান দুর্বল করছে।
সুত্র: এপি


