মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা রক্ষায় ৬৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন। বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের আওতায় চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ এবং দুটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণ করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলাধীন শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা রক্ষা’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাস্তবায়ন করবে।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় ধরা হয়েছে নদীতীর সংরক্ষণ কাজে। চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১২৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ব্যয়ের এই পরিমাণ নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায়ও প্রশ্ন ওঠেছে।
সূত্র জানায়, শুরুতে এ খাতে ৫০৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়। পরে পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরি পরিস্থিতির জন্য অতিরিক্ত জিওব্যাগ মজুতের সংস্থান বাদ দেওয়ায় এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয় কমে ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নির্ধারণ হয়।
এ বিষয়ে পাউবো জানিয়েছে, প্রকল্প এলাকায় মেঘনা নদীর তলদেশের গভীরতা (স্কাওয়ার ডেপথ) মাইনাস ৩৩ মিটার এবং নদীর স্রোতের গতি প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৬ মিটার হওয়ায় স্থায়ী সুরক্ষার জন্য ৫০ থেকে ৭০ মিটার দীর্ঘ অ্যাপ্রন, জিওব্যাগ এবং কংক্রিট ব্লকের সমন্বয়ে ভারী নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। ব্যয় আরও কমাতে হলে ডাম্পিং ভলিউম কমাতে হবে। এতে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন প্রতিরোধ সম্ভব হবে না বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিইসি সভায় শুধু নদীতীর সংরক্ষণ নয়, প্রকল্পের আরও কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নের ৮০০ মিটার বাঁধে কংক্রিট ব্লক ব্যবহার না করে টার্ফিংসহ মাটির বাঁধ নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাঁধ পুনর্বাসন ও ঢাল সংরক্ষণ কাজের ব্যয় আলাদাভাবে দেখাতে এবং প্রতি ২০০ থেকে ২৫০ মিটার পর পর প্রয়োজনীয় মাটির পরিমাণ ছক আকারে উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া দুটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণে ব্যয় ৩১ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে, মূল্য ও ভৌত কন্টিনজেন্সি মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা নির্ধারণ করতে এবং প্রকল্প-পরবর্তী বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সাত কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে তিন কোটি ৬১ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রয় পরিকল্পনায় ক্রয়পদ্ধতি ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
পাউবোর দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার প্রায় তিন হাজার ৮০৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকার সরকারি ও বেসরকারি সম্পদ নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে। পাশাপাশি প্রায় দুই হাজার ২০০ হেক্টর কৃষিজমি জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রায় ৬৫ হাজার ৪৭২ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
প্রকল্পের আওতায় ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসনের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এ ছাড়া ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণের মাধ্যমে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ কমানো এবং দুটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন ও সেচ সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবের পেছনে কারণ হিসেবে বলা হয়েছ- ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ও ধনিয়া এবং দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নে মেঘনা নদীর তীব্র ভাঙনের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার একর কৃষিজমি, বসতভিটা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় কৃষিজমি প্লাবিত হচ্ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করে বলেছে, এটি বাস্তবায়িত হলে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ও অবকাঠামো নদীভাঙনের হাত থেকে সুরক্ষা পাবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন ও ঢাল সংরক্ষণের মাধ্যমে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কমিশন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের সুপারিশ করেছে।


