জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলাটি তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সোমবার রাতে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান। তিনি বলেন, রিমান্ডে থাকা গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে জিজ্ঞাসাবাদসহ মামলার পরবর্তী তদন্ত এখন থেকে ডিবি করবে।
এর আগে সোমবার দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত গাজী নজরুলকে চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুদ্দোহা সরকার তাদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।
পুলিশের দাবি, মরিয়ম আত্মহত্যার সময় আসামিরা বাসায় ছিলেন কি না, তার আত্মহত্যার পেছনে আসামিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্ররোচনা ছিল কি না এবং তাকে মানসিক চাপ, ভয়ভীতি বা অন্য কোনোভাবে আত্মহত্যায় সহায়তা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে মামলার পলাতক আসামি গাড়িচালক ওবায়দুল ইসলামের ভূমিকা এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।
এর আগে রোববার রাতে মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলাটি করেন। এতে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম ও গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। ওবায়দুর রহমান পলাতক, তাকে খুঁজছে পুলিশ।
রিমান্ড শুনানিতে যা বলেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী
সোমবার বেলা ৩টা ১১ মিনিটে পুলিশ গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে আদালতে হাজির করে। পরে তাদের পক্ষের আইনজীবীরা ওকালতনামায় সই করেন। সোয়া ৩টার দিকে বিচারক এজলাসে ওঠেন এবং আদালতের পরিস্থিতি শান্ত রাখার নির্দেশ দেন। ৩টা ১৬ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। শুরুতেই বিচারক তদন্ত কর্মকর্তাকে মামলার অভিযোগ সম্পর্কে বলতে বলেন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে ওবায়দুর রহমানকে প্রলোভন দেখিয়ে মরিয়মকে বিয়েতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে তাকে বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং এ নিয়ে মামলাও হয়।
পিপি বলেন, গাজী নজরুল ন্যাম ভবনের বাসায় মরিয়মকে নিয়ে থাকতেন। একই বাসায় তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামও থাকতেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হাতে লেখা চিঠিতে মরিয়ম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেছেন। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হলেও এর পেছনে হত্যার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটি তদন্তসাপেক্ষ বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রকৃত সত্য উদঘাটনে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানান পিপি।
অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকসুদা ইসলামের পক্ষে আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমানসহ অন্যরা রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। তারা আদালতে বলেন, রিমান্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই। গাজী নজরুল একজন মুক্তিযোদ্ধা ও চারবারের সংসদ সদস্য। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উপস্থাপন করা হয়নি। দুজনই বয়স্ক এবং তারা তদন্তে সহযোগিতা করবেন। তাই রিমান্ড বাতিল করে জামিন দেওয়া হোক।
দুই পক্ষের শুনানি শেষে আদালত গাজী নজরুলের চার দিন এবং মাকসুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।
ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে মরিয়মের মরদেহ
মামলার এজাহার অনুযায়ী, রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ইসলাম ফোন করে মরিয়মের বাবাকে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। পরে তিনি মরিয়মের খালা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসংলগ্ন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে যান। সেখানে গিয়ে তারা লোকজনের ভিড় দেখতে পান। মরিয়ম যে কক্ষে ছিলেন, সেটির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানালা দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় মরিয়মকে ঝুলতে দেখা যায়।
পরে পুলিশ দরজা ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।
বিয়ের পর নির্যাতনের অভিযোগ
মরিয়মের বাবার করা এজাহারে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুনে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর মরিয়ম স্বামী ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের সঙ্গে ন্যাম ভবনের ওই বাসায় থাকতেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গাজী নজরুল ও মাকসুদা মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। বিভিন্ন সময়ে মরিয়ম মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের কাছে এসব নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার বাদীর অভিযোগ, স্বামী ও প্রথম স্ত্রীর নির্যাতন এবং আসামিদের প্ররোচনা সহ্য করতে না পেরে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন।
বিছানায় হাতে লেখা চিঠি
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, মরিয়মের বিছানা থেকে একটি হাতে লেখা চিঠি উদ্ধার করা হয়েছে। চিঠিতে বিশ্বাসভঙ্গ, মানসিক কষ্ট ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়ে কিছু কথা লেখা রয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে চিঠিটি মরিয়মের নিজের হাতে লেখা কিনা এবং এর সঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
গাড়িচালকের প্ররোচনার অভিযোগ
গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকেও আসামি করা হয়েছে। মরিয়মের পরিবারের অভিযোগ, ওবায়দুরের প্ররোচনায় গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। পরে গাজী নজরুল ও মাকসুদার নির্যাতন এবং আসামিদের প্ররোচনার কারণে মরিয়ম আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
আগেও ব্যক্তিগত ভিডিও নিয়ে আলোচনা
এর আগে গত জুলাইয়ে গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ভিডিওতে থাকা তরুণীকে মরিয়ম খাতুন বলে দাবি করেছিলেন গাজী নজরুল ইসলাম। তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, মরিয়ম তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই তাকে বিয়ে করেছেন।
পরে মরিয়মের একটি বায়োডাটা প্রকাশ্যে আসাকে কেন্দ্র করে বিয়ের সময় ও বিভিন্ন তথ্য নিয়ে আলোচনা হয়। ভিডিওটির সত্যতা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ও পাল্টা দাবি ওঠে।
২২ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের কথা জানায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল।
পল্লবী থানার মামলাতেও আসামি
মরিয়মের মরদেহ উদ্ধারের দিনই পল্লবী থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের নথি বিচারিক আদালতে জমা দেন গাজী নজরুল ইসলাম।
রোববার দুপুরে ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালতে হাজির হয়ে তিনি জামিননামা দাখিল করেন। এর আগে ১০ আগস্ট হাইকোর্ট ওই মামলায় তাকে আট সপ্তাহের জামিন দেন।
গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান ২১ জুলাই পল্লবী থানায় মামলাটি করেন। এতে গাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও আমিনুর রহমান, মাসুম বিল্লাহ, মোতাসিম বিল্লাহ ও রাকিবুল হাসানকে আসামি করা হয়।
এজাহারে ওবায়দুর রহমানকে মারধর ও গলা চেপে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওবায়দুরের ভাগনির সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটে বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন>>>
দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মহত্যা: এমপি নজরুল ও প্রথম স্ত্রী গ্রেপ্তার
এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি


