হংকংয়ের তাই পো জেলার আবাসিক এলাকা ওয়াং ফুক কোর্টে আগুনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ জনে। ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি উদ্ধারকর্মীদের বরাতে তথ্যটি নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা এপি।
ফায়ার সার্ভিস বিভাগ জানায়, ৯৪ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মীও আছেন। প্রায় ৯০০ মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এপির খবরে বলা হয়, আটটি সু-উচ্চ আবাসিক ভবনের কমপ্লেক্সটিতে হাজারেরও বেশি মানুষ থাকতেন। ঘনবসতিপূর্ণ ওই কমপ্লেক্সের সাতটি ভবনে গত বুধবার দুপুরের পর আগুন লাগে।
নির্মাণাধীন ভবনের বাঁশের কাঠামো ও নেটিং থেকে দ্রুত আগুন কমপ্লেক্সের প্রায় সব ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। সে আগুন পুরোপুরি নেভাতে বৃহস্পতিবারও লড়াই করছিলেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। কিছু কিছু ফ্ল্যাটের ভেতরে দ্বিতীয় দিনেও আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে দেখা যায়।
উদ্ধারকারীরা টর্চলাইট হাতে পুড়ে যাওয়া টাওয়ারগুলোর প্রতিটি ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে হতাহত ও নিখোঁজদের খোঁজ করছিলেন। এসময় ওয়াং ফুক কোর্ট কমপ্লেক্সের কিছু ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে ঘন কালো ধোঁয়া বের হচ্ছিল।
কর্তৃপক্ষ জানায়, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এখনো কিছু অ্যাপার্টমেন্টে কাজ করছেন এবং তারা টাওয়ারের সব ইউনিটে প্রবেশের চেষ্টা করছেন যাতে আর কোনো হতাহতের ঘটনা আছে কি না নিশ্চিত করা যায়।

ফায়ার সার্ভিসেস অপারেশনের উপপরিচালক ডেরেক আর্মস্ট্রং চ্যান বলেন, ‘আমাদের অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম প্রায় শেষ। আগুন নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে ধ্বংসাবশেষ ও জলন্ত ছাই থেকে যেন আবারও আগুন জ্বলে না ওঠে তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা কঠোর পরিশ্রম করছেন। আমাদের এর পরের কাজ হলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান।’
চ্যান বলেন, ‘আগুন এতো দ্রুত গতিতে টাওয়ারজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যে জরুরি উদ্ধারকর্মীরা তাৎক্ষনিকভাবে ভেতরে প্রবেশ করতেও মারাত্মক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। আমাদের একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মীও প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এখনো ভবনগুলোতে কত মানুষ নিখোঁজ বা আটকা আছেন তা পরিষ্কার নয়।’
এদিকে হংকংয়ের নেতা জন লি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৭৯ জনের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে তারা সবাই ভবনে আটকা আছেন। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নতুন কোনো তথ্য দেয়নি।
লি বলেন, ‘ওপরের তলাগুলো থেকে ধ্বংসাবশেষ ও স্ক্যাফোল্ডিং (বাঁশ ও নেটের নির্মাণসামগ্রী) পড়ে যাচ্ছিল। তাপমাত্রা বেশি থাকায়, ধোঁয়ার অন্ধকার এবং জরুরি গাড়ির প্রবেশপথ স্ক্যাফোল্ডিং ও ধ্বংসাবশেষে আটকে যাওয়ায় ভবনে ঢোকা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।’
ওয়াং ফুক কোর্টের এক বাসিন্দা লরেন্স লিকে তার স্ত্রীর খোঁজে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার পর আমি ফোনে তাকে বের হতে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি বাইরে বের হতেই করিডোর ও সিঁড়ি ধোঁয়ায় ভরে যায়, সব অন্ধকার হয়ে যায়, তাই বাধ্য হয়ে তিনি আবার ফ্ল্যাটে ফিরে যান। এখনও তার কোনো খোঁজ পাইনি।’

এদিকে ‘অনিচ্ছাকৃত হত্যার’ অভিযোগে টাওয়ারটির নির্মাণ কাজের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে আটক করেছে পুলিশ।
সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট আইলিন চুং বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি নির্মাণ কোম্পানির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা গুরুতর অবহেলা করেছেন।’ বৃহস্পতিবার পুলিশ প্রেস্টিজ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির অফিসেও তল্লাশি চালায়। এই কোম্পানিই টাওয়ার কমপ্লেক্সে সংস্কারকাজ পরিচালনা করছিল।
পুলিশ প্রমাণ হিসেবে বাক্সভর্তি নথিও জব্দ করেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়। তাদের দাবি, উচ্চ-আবাসিক ভবনগুলোর বাইরের দেয়ালে ব্যবহৃত কিছু নির্মাণ উপাদান অগ্নিরোধী মান পূরণ করেনি। এ কারণেই আগুন অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত ছড়িয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, একমাত্র অক্ষত টাওয়ারটির প্রতিটি তলার লিফট লবির জানালার কাছে অত্যন্ত দাহ্য প্লাস্টিক ফোমের প্যানেল রয়েছে। এতে ওপরের তলার মানুষেরা নিচে নামতে ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা জানিয়েছে, কমপ্লেক্সটিতে প্রায় দুই হাজার অ্যাপার্টমেন্টে প্রায় চার হাজার ৮০০ মানুষ থাকেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই বৃদ্ধ। ১৯৮০-এর দশকে নির্মিত এই কমপ্লেক্সে সম্প্রতি বড় ধরনের সংস্কারকাজ চলছিল। তারা সংস্কার প্রকল্পে সম্ভাব্য দুর্নীতি নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে।
এই আগুনের ঘটনা হংকংয়ের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনা। এর আগে ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে কাউলুনের একটি বাণিজ্যিক ভবনে আগুন লেগে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছিল।


