স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে কারাগারে শিশুসহ মা

স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে কারাগারে শিশুসহ মা
Advertisement
Advertisement

স্বামীকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছিল প্রতিপক্ষ। অবুঝ তিন সন্তানকে নিয়ে বিচারের আশায় আদালতের দরজায় কড়া নেড়েছিলেন গৃহবধূ ফাতেমা বেগম। কিন্তু প্রতিপক্ষের পাল্টা মামলায় দেড় বছরের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে তাকেই সাতদিন কাটাতে হলো কারাগারে। এসময় প্রাথমিকে পড়ুয়া অপর দুই বোন আশ্রয় নিয়েছিল এতিমখানায়।

এই ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নে। সাতদিন কারাবাস শেষে গত সোমবার সন্ধ্যায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন ফাতেমা বেগম। কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ইমরান হোসাইনের আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন।

যেভাবে ঘটনা শুরু

২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মহেশখালীর কুতুবজোমের কবির বাজারে ছিলেন ফিশিংবোট শ্রমিক মুহাম্মদ কাশেম। সেখান থেকে তাকে ধাওয়া করে নিজ বাড়ির দরজায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ দুর্বৃত্তরা। পরদিন নিহতের স্ত্রী ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে ১০ জনকে আসামি করে মহেশখালী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে কাশেমের আপন মামা গফুর মিয়াসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।

হুমকি ও পাল্টা মামলা

স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে নিরাপত্তাঙ্কায় দিন কাটাচ্ছিলেন ফাতেমা। মামলা তুলে নিতে ও আসামিদের নাম বাদ দিতে তাকে একের পর এক ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল। বাধ্য হয়ে ২০২৫ সালের মে মাসে মহেশখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ফাতেমা। কিন্তু তাতেও রক্ষা মেলেনি।

আরও পড়ুন

কাশেম হত্যা মামলার চার নম্বর আসামি রাসেলের মা নুরজাহান বেগম ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট আদালতে পাল্টা একটি ভাঙচুর ও লুটপাটের নালিশি দরখাস্ত করেন। অভিযোগ করা হয়, ২৪ মে সকালে ফাতেমা ও তার স্বজনেরা আসামিদের বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন।

বিতর্কিত তদন্ত

এই নালিশি মামলায় মহেশখালী থানার এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা দাবি করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন। তবে প্রতিবেদনে ব্যবহার করা সাক্ষী নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগম সংবাদকর্মীদের কাছে জানান, তারা কোনো সাক্ষ্য দেননি। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহমুদুল হকও নিশ্চিত করেন, কাশেম হত্যার পর তার পরিবারকে চাপে রাখতে ও প্রতিশোধ নিতেই এই মামলা করা হয়েছে।

কোলে শিশু, পেছনে এতিমখানা

গত ৩১ আগস্ট রাতে ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি ও এক আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শাশুড়ি ও আত্মীয় জামিন পেলেও, গত ১ সেপ্টেম্বর আদালত ফাতেমাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। দেড় বছরের শিশুসহ কারাগারে যায় ফাতেমা।

মা কারাগারে চলে যাওয়ায় ফাতেমার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় মেয়ে রাজমিন আকতার ও প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট মেয়ে মিশকাত জান্নাতকে আশ্রয় নিতে হয় কুতুবজোমের ‘তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায়’।

অবশেষে জামিন, তবু কাটেনি শঙ্কা

সাতদিনের আইনি লড়াই শেষে মা ও শিশু কারামুক্ত হলেও তাদের জীবনে নেমে আসা আঁধার এখনো কাটেনি। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নির্মম হত্যাকাণ্ডে স্বামীকে হারানোর পর থেকে সন্তানদের সুরক্ষা, ভয়ভীতি, আর উল্টো মামলায় জেলে যাওয়া—গত দেড় বছরে ফাতেমার জীবন এক বিভীষিকাময় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে। আদালত ও প্রশাসনের কাছে এই নির্যাতিত পরিবারের এখন একটাই দাবি—সত্যিকারের আসামিদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। আর পাল্টা মামলার হয়রানি থেকে যেন তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর