মেহেরপুরের গাংনী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মাঝে মাথাভাঙ্গা নদীর ওপর নির্মাণ হয়েছে গার্ডার সেতু। কিন্তু উদ্বোধনের চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেতুর এক প্রান্তে সংযোগ সড়ক না হওয়ায় তা এখন এলাকাবাসীর জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আটকে আছে সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ।
এখন মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে দুই উপজেলার জেলার মানুষকে ঘুরতে হচ্ছে ৯ কিলোমিটার পথ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এলজিইডির অধীনে বামন্দী এইচডি থেকে প্রাগপুর জিসি ভায়া মধুগাড়ি ঘাট সড়কের মাথাভাঙা নদীর ওপর এই গার্ডার সেতুটি নির্মাণ করা হয়। সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ২৯ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৯ টাকা। স্থানীয়দের আশা ছিল, এই সেতুর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও শিক্ষাসহ নানাবিধ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দুই জেলার মধুগাড়ি-বেতবাড়িয়া সংযোগ সেতুর নির্মাণকাজ চার বছর আগেই শেষ হয়েছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর অংশে সংযোগ সড়ক তৈরি হলেও গাংনী অংশে এখনো কোনো কাজ হয়নি।
সেতুটি নির্মাণের ফলে নদীতে নৌকা চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে নদী পার হওয়ার আর কোনো সহজ রাস্তা নেই। এতে করে কৃষিপণ্য পরিবহন বা জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য দুই পারের মানুষকে এখন ৯ কিলোমিটার পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে।
কুষ্টিয়া দৌলতপুর উপজেলার মোমিনপুর গ্রামের কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী তমা খাতুন জানান, মোমিনপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই থানার শিক্ষার্থীরাই পড়াশোনা করে। তাদের অংশের সংযোগ সড়ক আগে শেষ হলেও অন্য প্রান্ত থেকে নামার সড়ক না থাকায় তারা সেতু ব্যবহার করতে পারছেন না।
দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে গাংনীতে ব্যবসা করা দৌলতপুর উপজেলার দাঁড়ের পাড়া গ্রামের গরু ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম জানান, আগে তিনি নৌকায় করে যাতায়াত করতেন। কিন্তু সেতু হওয়ার পর নদী দিয়ে আর নৌকা চলে না, আবার সংযোগ সড়কও নেই। ফলে তাকে গাংনী এলাকায় আসতে ৯ কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে।
হাড়াভাঙা গ্রামের কৃষক লিটন হোসেন জানান, নদীর দুই পাশেই তার জমি আছে। সেই জমিতে উৎপাদিত সবজি তিনি দুই উপজেলার হাটে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, যখন সেতু ছিল না, তখন অন্তত নৌকা দিয়ে যাতায়াত করা যেত। কিন্তু এখন নৌকা ও রাস্তা কোনটিই না থাকায় সবজিবোঝাই ভ্যান নিয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরতে গিয়ে তার খরচ ও ভোগান্তি দুই-ই বেড়েছে।
একই গ্রামের সবজি ব্যবসায়ী নাহারুল ইসলাম জানান, আগে তিনি নৌকায় যাতায়াত করে বিভিন্ন হাটে সবজি বিক্রি করতেন। এখন সেতু হয়েও রাস্তা না থাকায় তার মতো ছোট ব্যবসায়ীদের ৯ কিলোমিটার ঘুরে হাটে যেতে হচ্ছে।
বেতবাড়ীয়া গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী আক্ষেপ করে বলেন, সেতু হওয়ার খবরে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ চার বছরেও রাস্তা না হওয়ায় সেই খুশি এখন ম্লান হয়ে গেছে।
মধুগাড়ি গ্রামের আকরামুল ইসলাম জানান, সেতু পার হতে মাত্র ৫ মিনিট সময় লাগার কথা থাকলেও সড়ক না থাকায় ৯ কিলোমিটার পথ ঘুরতে হচ্ছে। দীর্ঘপথ এড়াতে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে সেতুতে ওঠা-নামা করছেন।
জমি অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নাহরূল ইসলাম জানান, সেতুর নিচে তাদের বড় আয়তনের জমি রয়েছে। তার মতে, সেতুটি সচল হলে এলাকার মানুষের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি জমির দামও বাড়বে। তাই ন্যায্যমূল্য পেলে জমি দিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
অন্যদিকে, গাংনী উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী মো. রোকনুজ্জামান জানান, সেতু নির্মাণের আগে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর তারা জমির বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম দাবি করায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হলেই দ্রুত সড়কের কাজ শুরু করা হবে।


