বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের পাহাড়জুড়ে মেঘের গর্জন। তবে এই শব্দ বৃষ্টির নয় বরং বন্দুকের গুলির। যা ভেসে আসছে নাফ নদীর ওপার থেকে। ক্ষীণ কিন্তু ছন্দবদ্ধ বিস্ফোরণ। আর এই শব্দ সঙ্গে নিয়ে আসছে একটি যুদ্ধের প্রতিধ্বনি, যা ক্রমেই বাংলাদেশের কাছে এগিয়ে আসছে।
নাইক্ষ্যংছড়ির ধানক্ষেত এবং তুমব্রুর কাদামাথা তীরের গ্রামবাসীরা এখন সংঘর্ষের শব্দের মধ্যেই ঘুমাতে যায়। শব্দ বাড়লেই জেলেরা তড়িঘড়ি করে তাদের নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে রাখে। আর বন্দুকের গুলির মতোই বিরামহীনভাবে দুই পক্ষের ছড়ানো গুজব ভেসে বেড়ায় সেখানকার বাতাসে।
বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলাকে মিয়ানমারের রাখাইন বা আরাকান থেকে বিভক্তকারী সীমান্তটি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠেছে। দুটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী—আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়েছে আরাকান আর্মি (এএ)। এদের মধ্যে আরাকান আর্মি হলো রাখাইনভিত্তিক মিলিশিয়া বাহিনী। যারা ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
আরাকান আর্মি এরই মধ্যে রাজধানী সিত্তে এবং কিয়াউকফিউসহ পুরো রাখাইন রাজ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কিয়াউকফিউ হলো রাজ্যের বেশ কৌশলগত কেন্দ্র, যেখানে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পাইপলাইন, একটি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং সেই সঙ্গে ভারতের মদদপুষ্ট একটি বড় বন্দর প্রকল্প রয়েছে।
প্রতিটি পক্ষই অন্যকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেয় এবং জোর দিয়ে বলে যে কেবল তারাই তাদের জনগণকে রক্ষা করছে।
মিয়ানমারের এসব দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে বাংলাদেশকে এরই মধ্যে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছে।
আরএসও গত ২১ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর ‘অসহনীয় অপরাধ’—হত্যা, লুটপাট, যৌন সহিংসতা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ আনে। সেইসঙ্গে আরএসওকে ‘ইসলামী চরমপন্থী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াসকে ‘মানহানিকর ও বানোয়াট’ বলে উড়িয়ে দেয়।
এর কয়েকদিন পর বিবৃতি দিয়ে এর জবাব দেয় আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা, ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ইউএলএ)। তারা আরএসও এবং আরসার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ভেতর ঘাঁটি তৈরি করে সেখান থেকে ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’ পরিচালনার অভিযোগ তোলে।
তাদের দাবি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ‘দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের’ সহায়তায় বাংলাদেশের ভূখণ্ড অনুপ্রবেশ, অতর্কিত হামলা এবং ড্রোন নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

অবশ্য এসব অভিযোগ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। যদিও দেশের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয়, নাইক্ষ্যংছড়ি-তুমব্রু এলাকার অপর পাশে গোলাগুলি ও মর্টারের গোলা ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে। যার ফলে সীমান্ত সংলগ্ন বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষকে আতংকের মধ্যে বসবাস করছেন।
এরই মধ্যে গত ১১ অক্টোবর এক বিবৃতিতে ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান সতর্ক করে বলে যে, যদি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তার সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনে এবং চরমপন্থীসমর্থক গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে এটি কেবল বাংলাদেশ অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং সীমান্ত ও আসিয়ান অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যও সন্ত্রাসী হুমকি তৈরি করতে পারে।
তুমব্রুর এক বাংলাদেশি কৃষক বলেন, ‘আমরা এখন প্রতি রাতেই গুলির শব্দ শুনি। অন্ধকার নামলে সেনারা (বিজিবি) ভেতরে থাকে। আমরা শুধু প্রার্থনা করি যেন কোনো বিপথগামী গুলি আমাদের খুঁজে না পায়।’
পানির একটি সরু ফিতার মতো নাফ নদী একসময় দুটি রাষ্ট্রকে পৃথক করেছিল, এখন সেই জলাধারই দুটি যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষীণ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিয়ানমারের দিকে আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বেশিরভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তারা সামরিক জান্তার কাছ থেকে ভূখণ্ড কেড়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এতে জাতিগত বিভাজন আরও গভীর হয়েছে।
সেখানকার রোহিঙ্গা নাগরিকরা বলছেন, তারা সামরিক বাহিনী এবং রাখাইন মিলিশিয়া; উভয়ের ভয়ের মধ্যেই বসবাস করেন। আর সেখানে নতুন সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ভারে ন্যুজ্ব কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো।
এসব প্রসঙ্গে কূটনীতিকরা সতর্ক করে বলছেন, যদি এই সংঘর্ষ চলতে থাকে, তবে এই অঞ্চলে আরেক দফা বাস্তুচ্যুতি দেখতে হতে পারে। এমনও হতে পারে যে, মিয়ানমারের যুদ্ধের আগুন বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ঢাকাভিত্তিক একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘এটা আর শুধু শরণার্থী সংকট নেই। বরং এটি বাংলাদেশের দোরগোড়ায় একটি বহুমুখী ছায়া যুদ্ধে পরিণত হচ্ছে।‘
রাখাইন রাজ্যের এই যুদ্ধ শুধু স্থানীয় নয়। এটি বঙ্গোপসাগরে বিলিয়ন ডলারের স্বার্থ থাকা চীন ও ভারতের মধ্যে তীব্রতর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বেইজিংয়ের জন্য, রাখাইন হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের (সিএমইসি) একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মহাসড়ক, পাইপলাইন এবং বন্দরের এমন একটি নেটওয়ার্ক যা চীনকে ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার দেয়। কিয়াউকফিউর নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্র বন্দরটি সেই লক্ষ্যকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো জান্তা এবং আরাকান আর্মি উভয়ের সঙ্গেই কার্যকরী সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফলে যুদ্ধের মধ্যেও নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, ভারত এক ধরনের কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে। এর নিজস্ব ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট করিডোর’ চীন এবং রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে গেছে। এ দুটি রাজ্যই সংঘাতে নিমজ্জিত।
নয়াদিল্লি তার রুটগুলো সুরক্ষিত করতে স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে নীরবে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্তে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় তার বৃহত্তর সংযোগ স্থাপনের আকাঙ্ক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
চীন অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, ভারত প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে নিরাপত্তা খুঁজছে এবং বাংলাদেশ শান্তি রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে। এরপরেও তিনটি দেশই তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার সবচেয়ে কঠিন পররাষ্ট্রনীতি পরীক্ষার মুখোমুখি। এই সরকার তার ভূখণ্ড থেকে কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীকে কার্যক্রম চালাতে না দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বন-নদী আর শরনার্থী শিবির সম্বলিত দীর্ঘ ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বান্দরবানের নিরাপত্তা বাহিনী মিয়ানমারে গোলাগুলি বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছে। আবার কক্সবাজারে কর্মরত বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা সতর্ক করে বলছেন যে, গোষ্ঠীগত সহিংসতায় জর্জরিত শিবিরগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য সংগ্রহের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
টেকনাফ ও উখিয়ার স্থানীয় বাসিন্দারাও এই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, যদি এই লড়াই উত্তর দিকে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বাংলাদেশকেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর কাছে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। কিন্তু মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এতটাই গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে যে প্রচলিত মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা আর কোনো কাজে লাগছে না।
এখন প্রতিটি পক্ষই নিজেদের ভুক্তভোগী এবং জনগণের মুক্তিদাতা হিসেবে চিত্রিত করছে। আরএসও এবং আরসার দাবি, তারা রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছে।
অন্যদিকে আরাকান আর্মির দাবি, তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে রাখাইন সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে। আর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা দুর্বল হলেও বেশ হিসাবি। তার শত্রুরা একে অন্যকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মাধ্যমে আসলে জান্তাকেই লাভবান করছে।
এরই মধ্যে সীমান্ত হয়ে উঠছে বিপজ্জনক। সেনারা সার্চলাইটের নিচে নদীর তীরে টহল দিচ্ছে। শরণার্থীরা পারাপারের জন্য রাতের অন্ধকারের অপেক্ষা করছে এবং দুই পাশের বাসিন্দারাই সেই শব্দের জন্য কান পেতে আছে যা এখন তাদের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে। আর সেটি হলো পাহাড়ের ওপার থেকে ভেসে আসা যুদ্ধের ক্ষীণ শব্দ।
বাংলাদেশের জন্য, এর চেয়ে বড় সংকট আর হতে পারে না। আরেকটি শরণার্থী প্রবাহ এলে তা বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে; সীমান্তের ওপার থেকে আসা আরেকটি বিপথগামী গুলি একটি আঞ্চলিক সংকটের আগুন দিতে পারে।
চীন ও ভারতের জন্য এই সংঘাতটি তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ এবং একটি সতর্কবার্তা যে, কীভাবে স্থানীয় যুদ্ধগুলো যেকোনো মুহূর্তে কৌশলগত যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
এই সীমান্ত আর কেবল মানচিত্রের কিছু রেখা নয়। বরং এটি শক্তিধর দেশগুলোর মাঝখানের ফল্ট লাইন। যার মূল্য দিতে হচ্ছে মাঝখানে আটকা পড়া মানুষদের।


