ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন এক ‘আতঙ্ক’ হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সম্প্রতি একাধিক নারী শিক্ষক-শিক্ষার্থী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলেও, অভিযোগ নিষ্পত্তিতে প্রশাসনের ধীরগতিতে ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা।
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে একাধিক ফেক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ভিন্ন মতাদর্শের নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানোর অভিযোগ উঠেছে একাধিকবার।
এই গ্রুপেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে, গত ১৫ মে শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি জানান, জিডির কপি উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খানের কাছে জমা দিলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত সিনেট সদস্য হয়েও এখনো পর্যন্ত আমার অভিযোগের কোনো সুরাহা পাইনি। সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার কীভাবে পাবে?’
তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ নামের ফেসবুক গ্রুপটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হলেও, গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেলের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়। এ ছাড়া গ্রুপটি নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের পারপাস সার্ভ করছে।
ছবি বিকৃত করে ফেসবুকে পোস্ট করার এবং অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগে গত নভেম্বরে শাহবাগ থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করেছেন ঢাবির শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন মোনামি। আদালত ঘটনাটি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট থানাকে নির্দেশ দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তার নেতিবাচক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রোকেয়া হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাকিবা সুলতানা বন্না জানান, হল কমিটি প্রকাশ হলে আনন্দটুকু ভাগ করে নিতে তালিকাটি ফেসবুকে শেয়ার করেন তিনি। ওই পোস্টে তার বাবা তাকে ‘অভিনন্দন’ জানিয়ে কমেন্ট করেন। বাবার সেই কমেন্টে ভীষণভাবে হেনস্তা করা হয় তাকে।
বন্না বলেন, ‘বাবার কমেন্টের জবাবে আমাকে উদ্দেশ করে অশালীন ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। নিজের মেয়েকে নিয়ে এমন অসত্য ও নোংরা মন্তব্য শুনে বাবার কেমন লেগেছে, আমি তা কল্পনাও করতে পারি না।’
যৌন নিপীড়ন, বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধের অংশ হিসেবে গত ২৬ জুন ‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সম্প্রতি কমিটির কাছে অনেক বেশি অভিযোগ জমা পড়ছে বলে জানালেন এর আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. উপমা কবির।
তিনি বলেন, ‘আগে হয়তো বিষয়টা সবার নজরে আসেনি, কিন্তু এখন তা সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি যেন অমীমাংসিত অভিযোগগুলো যত দ্রুত সম্ভব সমাধান করা যায়’।
একই সঙ্গে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আরেকটি কমিটি গঠন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শাহনাজ হুদা। বুলিং ও র্যাগিং সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ শিক্ষার্থীরা প্রথমে নিজ নিজ অনুষদে জমা দেন, পরে সেটি কমিটির কাছে আসে বলে জানান তিনি।
বর্তমান প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে যৌন হয়রানি কিংবা বুলিং সংক্রান্ত অভিযোগ করতে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত হন বলেও অভিযোগ আছে। তা ছাড়া এসব অভিযোগের তদন্ত বা নিষ্পত্তিতেও প্রশাসনের আগ্রহ কম। একটি অভিযোগ দিলে তা তদন্ত করতেই বছর পেরিয়ে যায়। ফলে অভিযোগ করে উল্টো ঝামেলায় পড়তে চান না অনেকে।
প্রায় এক বছর আগে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে প্রক্টর অফিসে গিয়েছিলেন শিক্ষার্থী তাজফিহা উখরোজ। সেখানে তাকে জানানো হয়, অভিযোগটি নিজের বিভাগে জমা দিতে হবে। ডিপার্টমেন্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এক বছরের মধ্যে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বারবার যোগাযোগ করেও তদন্তের কোনো অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু জানতেও পারেননি।
‘পরে এক শিক্ষক অন্য একটি প্রক্রিয়া সাজেস্ট করেন, কিন্তু তা জটিল ও দীর্ঘ হওয়ায় মনে হয়েছে মামলাটি আমার পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেও ঝুলে থাকবে,’ বলেন তাজফিহা।
এ বিষয়ে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা জানান, উপাচার্য, উপউপচার্য কিংবা প্রক্টর বরাবর দায়ের করা অভিযোগগুলো প্রথমে সিন্ডিকেট পাস হয়। তারপর ওই কমিটিগুলোতে পাঠানো হয়। যে কারণে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সময় লেগে যায়।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, সাইবার বুলিং শুধুমাত্র অনলাইনে হয়রানি নয়; বরং এটি একাডেমিক পরিবেশ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও বাধাগ্রস্ত করে।
সামসুন্নাহার হলের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফা ইসলাম বলেন, ‘এখন কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয়ে পোস্ট দেওয়ার আগে ভাবতে হয়; কে কখন স্ক্রিনশট নিয়ে বিকৃত করে ছড়িয়ে দেবে।’
নারীদের ওপর ধারাবাহিক সাইবার আক্রমণ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এর প্রতিবাদও ‘সিলেক্টিভ’- এমন অভিযোগ তুলেছেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক নূজিয়া হাসিন রাশা।
তিনি বলেন, যেসব নারী পিতৃতন্ত্রকে প্রশ্ন করেন বা পিতৃতন্ত্রের স্বার্থে কাজ করেন না, তাদেরকেই ট্যাগিং, অপমান ও অনলাইন বুলিংয়ের মাধ্যমে চুপ করানোর চেষ্টা চলছে। একই গোষ্ঠী আবার সেই কাঠামোর ভেতরের কিছু নারীর পক্ষেও অবস্থান নিচ্ছে।
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ’ গ্রুপটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু নির্বাচনের আগেও বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকায় কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্মটি দিন দিন খুব নোংরা হয়ে যাচ্ছে। এই গ্রুপে অভিযুক্তদের পরিচয়ও শনাক্ত করা যায় না। কারণ, গ্রুপের একটা অংশ বেনামে বা ফেক আইডি থেকে বাজে মন্তব্য করে।
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান বলেন, এতদিন সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কমিটি ছিল অকার্যকর অবস্থায় ছিল। হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে অত্যন্ত দক্ষ মানুষদের নিয়ে কমিটিগুলোকে সক্রিয় করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল গঠন করা হয়েছিল। সেটার আলোকে আরও একটি শক্তিশালী কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটির সদস্যরা অত্যন্ত যোগ্য, তারা সাইবার বুলিংয়ের মতো বিশেষায়িত বিষয়ের টেকনিক্যালিটি বোঝেন।
শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বলেও জানান উপাচার্য। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।


