জুলাই-আগস্ট এলেই চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় বদলে যায় চেনা দৃশ্য। নদীতে সারি সারি মাছ ধরার নৌকা, ঘাটে ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা আর ঝুড়িভর্তি রুপালি ইলিশ জানান দেয় ভরা মৌসুমের। তবে এবার সেই চেনা চিত্র অনেকটাই অনুপস্থিত। দেশের অন্যতম বড় ইলিশের বাজার বড় স্টেশন মাছঘাটে ভরা মৌসুমেও মিলছে না প্রত্যাশিত ইলিশ।

একসময় এই মৌসুমে প্রতিদিন বড় স্টেশন ঘাটে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ মণ পর্যন্ত ইলিশ উঠত। এখন সেখানে ১০০ থেকে ২০০ মণ ইলিশ সংগ্রহ করতেই হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। নদী থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাজারেও। বেড়ে গেছে ইলিশের দাম।
ঘাটে যে এক কেজি ওজনের ইলিশ আগে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকা। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে জাতীয় মাছটির দাম।

ইলিশের এই সংকটের কারণ হিসেবে নদীর পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, তলদেশে পলি জমে চর ও ডুবোচর তৈরি হওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইলিশের জীবনচক্রের সঙ্গে নদীপথের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সাগর থেকে নদীতে আসা এবং প্রজননের জন্য নির্দিষ্ট জলপথ ব্যবহার করে এই মাছ। নদীর সেই স্বাভাবিক প্রবাহ ও চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হলে ইলিশের বিচরণ ও প্রজননও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ইলিশ সংরক্ষণে বাংলাদেশে মা ইলিশ ও জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা, অভিযানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে ইলিশের উৎপাদন ও সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও নদীর পরিবেশ ও নাব্যতা ঠিক রাখা না গেলে শুধু সংরক্ষণ কার্যক্রম দিয়ে সংকট মোকাবিলা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাঁদপুরের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গেও ইলিশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জেলে, নৌকার মাঝি, মাছ ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে ঘাটকেন্দ্রিক অসংখ্য ছোট ব্যবসা এই মাছের ওপর নির্ভরশীল। ভরা মৌসুমে ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের ব্যবসাতেও পড়ছে চাপ।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ নিশ্চিত করতে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, প্রয়োজনীয় স্থানে খনন এবং নদীর পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ জরুরি। তা না হলে চাঁদপুর শুধু ইলিশের বাণিজ্যই হারাবে না, দেশের ইলিশকেন্দ্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও হারাতে পারে তার দীর্ঘদিনের সংযোগ।


