জামালপুরে জলাশয়গুলোতে দেশীয় মাছের আকাল

জামালপুরে জলাশয়গুলোতে দেশীয় মাছের আকাল
নানান দেশীয় প্রজাতির মাছ। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

একসময় দেশীয় মাছের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল জামালপুরের যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই, দশআনী ও সুবর্ণখালী নদী। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব নদীতে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে মাছের পরিমাণ। ফলে জীবিকার চরম সংকটে পড়েছেন জেলার প্রায় ২২ হাজার নিবন্ধিত জেলে। অনেকেই বাধ্য হয়ে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন, কেউবা জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমাচ্ছেন শহরে।

ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জাল টেনেও এখন আর আগের মতো বাতাই, বাঁশপাতালি, বউমাছ বা চিংড়ির দেখা মেলে না।

ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল এলাকার জেলে জলধর নমশূদ্রের জীবনচিত্র এই বাস্তবতারই এক করুণ প্রতিচ্ছবি। ভোরে সঙ্গীদের নিয়ে যমুনায় গেলেও কয়েক ঘণ্টা জাল টেনে তার আয় হয় মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকার মাছ। এই সামান্য আয়ে তিনি তিন কন্যা সন্তানের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

হতাশা প্রকাশ করে জলধর বলেন, ‘একটা খেও দিতে এক দেড় ঘণ্টা টাইম লাগে। মাছ ওঠে এক দেড়শো টাকার। ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে জাল-নৌকা কিনছি। এগুলো দিয়ে খাব নাকি বিক্রি করব? আমার আর পোষায় না। আমার তিনডা মেয়ে আছে, লেখাপড়া আছে, সংসার খরচ আছে। মেয়েগুলাকে কেমনে বিয়ে দিমু এই এক দেড়শো টাকার ভেতর। নদীতে মাছ নাই। দিন দিন কমে যাইতাছে। পানি আছে, আগের মতো মাছ নাই।’

জেলার নদী নির্ভর অধিকাংশ জেলের অবস্থাই প্রায় একই রকম। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মাছ ধরছেন জেলে জগন্নাথ নমশূদ্র। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আগে নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া গেলেও এখন সেসব প্রায় দেখাই যায় না।’

নদীতে মাছ না থাকায় বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন অনেকেই। ইসলামপুরের মাছ ব্যবসায়ী নিতাই নমশূদ্র তাদেরই একজন। নিতাই জানান নদীর মাছ দিয়ে আর সংসার চলে না বিধায় এখন পুকুরের মাছ কেনাবেচা করেই তাকে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন

স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি ও সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ব্যবহারের কারণে প্রতিনিয়ত মাছের পোনা ধ্বংস হচ্ছে। এ ছাড়া নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানি দূষণ এবং বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণের ফলে সংকুচিত হয়েছে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র।

জেলে নিরঞ্জন চন্দ্র দাস দাবি করেন, বড় বেড়জাল ও চায়না জাল দিয়ে মাছ ধরার সময় প্রচুর পোনা নষ্ট হয়। তিনি বলেন, ২০-৩০ বছর আগে আমরা যে মাছগুলো দেখছি, মারছি, খাইছি, এই মাছগুলো এখন পাওয়া যাচ্ছে না। বড় বড় বেড়জাল দিয়ে মাছ ঘিরে মারে। যদি ওঠে ৫০ হাজার, দেড় লাখ মাছ নষ্টই হয়। ডিম যে হচ্ছে পোকার মতো, ওরা তো ফেলে দিচ্ছে, বুঝতে পারছে না। এই নেটজাল, কারেন্ট জাল, চায়না জাল দিয়ে পাঁচটা মাছ ধরলে ২০টা নষ্ট করে। যার জন্য আমাদের বাংলাদেশে মাছের সংকট দেখা যাচ্ছে।’

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার এই সংকটের বৈজ্ঞানিক কারণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘দিন দিন জলাশয়ের গভীরতা কমে যাওয়া এবং পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দেওয়ার কারণে মাছ স্রোতশীল পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের প্রজননে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।

প্রাকৃতিক ও চাষের মাছের স্বাদের পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খাবারে ভেজাল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যের অভাবই এর জন্য দায়ী।’

জামালপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আ. ন. ম. আশরাফুল কবীর জানিয়েছেন, জামালপুরের ২৫০টি দেশীয় প্রজাতির মাছের মধ্যে প্রায় ৫০টি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে জেলার সাত উপজেলায় সাতটি অভয়াশ্রম রয়েছে এবং ব্রহ্মপুত্র নদে আরও দুটি স্থায়ী অভয়াশ্রম নির্মাণের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলায় আরও অভয়াশ্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ এবং অভয়াশ্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশীয় মাছের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরে বর্তমানে ২১ হাজার ৩১৮ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। নদীকেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা এখন হুমকির মুখে। কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশীয় মাছ হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জেলে সম্প্রদায়ের এই প্রাচীন পেশাটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad