লেবাননে সাংবাদিকদের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সে ইসরায়েলি হামলায় তিন সাংবাদিকসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েকজন।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র চলমান যুদ্ধের মধ্যেই শনিবার দক্ষিণ লেবাননে বিভিন্ন যান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, জেজ্জিন সড়কে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত একটি সাংবাদিকদের গাড়িতে ইসরায়েলের হামলায় সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনের সাংবাদিক ফাতিমা ফতুনি, তার ভাই ও সহকর্মী মোহাম্মদ ফতুনি এবং সংবাদমাধ্যম আল-মানারের সাংবাদিক আলি শুয়াইব নিহত হন।
টেলিভিশন চ্যানেল আল মায়াদিন জানায়, তাদের সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়িটিতে অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র নির্ভুলভাবে আঘাত হানে। হামলায় আরও কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন।
একই ঘটনায় কাছাকছি থাকা একটি অ্যাম্বুলেন্সকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে জানিয়েছে আল মায়াদিন। এতে একজন প্যারামেডিক নিহত হয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, শনিবার দক্ষিণ লেবাননে স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট পাঁচটি আলাদা হামলায় আরও আটজন প্যারামেডিক নিহত এবং অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন।
সংস্থাটির প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস জানান, জুতার আল-শারকিয়ায় এক হামলায় পাঁচ স্বাস্থ্যকর্মী নিহত ও দুইজন আহত হন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর।
এছাড়া কাফর তিবনিতে দুইজন নিহত ও তিনজন আহত হন। গন্ধুরিয়ায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় একজন এবং জেজ্জিনে আরেকজন প্যারামেডিক নিহত হন। কাফর দাজ্জালে হামলায় আহত হয়েছেন দুই প্যারামেডিক।
এদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননে সাংবাদিকদের ওপর হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছে, নিহত আলি শুয়াইব ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একটি গোয়েন্দা ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থানের ওপর নজরদারি চালাচ্ছিলেন।
আইডিএফের দাবি, সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে তিনি হিজবুল্লাহর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন। আল মায়াদিন ও আল-মানার কোনো সংবাদমাধ্যমই ইসরায়েলের এই বক্তব্য মেনে নেয়নি।
আল-মানার আইডিএফের দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, আলি শুয়াইব তাদের চ্যানেলের অন্যতম প্রধান যুদ্ধসংবাদদাতা ছিলেন এবং বহু বছর ধরে লেবাননে ইসরায়েলি হামলার খবর দিয়েছেন।
এর আগে চলতি মাসে বৈরুতে আরেক হামলায় আল-মানারের রাজনৈতিক অনুষ্ঠান বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শেরিও নিহত হন।
আল-মায়াদিনের নিহত সাংবাদিক ফাতিমা ফতুনির জন্যও এই যুদ্ধ নতুন নয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে এক ইসরায়েলি হামলায় তার চাচা ও পরিবারের সদস্যরা নিহত হন, যার খবর তিনি নিজেই টেলিভিশনে তুলে ধরেছিলেন।
সংঘাত শুরুর পর থেকে আল মায়াদিন এরইমধ্যে ছয়জন সাংবাদিক হারিয়েছে। এর আগে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন চ্যানেলটির সাংবাদিক ফারাহ ওমর, রাবিহ মেমারি, ঘাসান নাজ্জার ও মোহাম্মদ রেদা।
ইসরায়েল এর আগে ফিলিস্তিনের গাজায়ও ২৭০ জনের বেশি সাংবাদিককে হত্যা করেছে এবং প্রায়ই প্রমাণ ছাড়াই সাংবাদিকদের ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ তোলে।
অ্যাম্বুলেন্স এবং সাংবাদিকদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেন, ‘এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। পেশাগত দায়িত্ব পালনরত বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা “স্পষ্ট অপরাধ” এবং এটি যুদ্ধকালীন সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার সব নিয়ম ভঙ্গ করে।’
দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামও একে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন।
দক্ষিণ লেবাননের টাইর শহর থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ওবাইদা হিট্টো জানান, হামলার সময় আশপাশে উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরা জানান, তারা কেবল নিজেদের কাজ করছিলেন। বিশ্বকে প্রকৃত যুদ্ধ পরিস্থিতির খবর দিচ্ছিলেন এবং ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারা এ কাজ চালিয়ে যাবেন।
সাংবাদিকদের এই হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে ১২৯ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের জন্য ইসরায়েল দায়ী বলে দাবি করেছে সিপিজে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের রেকর্ড করা ইতিহাসে ইসরায়েলই সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক হত্যা করেছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে ক্রমাগত ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়ে দক্ষিণ লেবাননের স্বাস্থ্যব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডব্লিউএইচও-এর তথ্যমতে, এরইমধ্যে চারটি হাসপাতাল ও ৫১টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও কয়েকটি সীমিত পরিসরে চালু থাকা চিকিৎসাকেন্দ্র যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এদিন দক্ষিণ লেবাননের দেইর আল-জাহরানি শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একজন লেবানিজ সেনাও নিহত হন বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় সংবাদ সংস্থা।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নারী ও শিশুসহ এখন পর্যন্ত এক হাজার ১৪২ জন নিহত এবং তিন হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।


