বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সমুদ্রপথে সরাসরি পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় পাকিস্তানি পণ্য আমদানিতে সংকটে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিকল্প রুট ব্যবহার করায় পণ্য পৌঁছাতে এখন প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগছে। আমদানি খরচও বেড়েছে শঙ্কাজনক হারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া বাংলাদেশ-পাকিস্তান সরাসরি শিপিং সংযোগ গত ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক নৌ-পরিবহন নেটওয়ার্কের বিঘ্নের কারণে এ রুটে আর জাহাজ চলাচল হচ্ছে না।
দুবাইভিত্তিক ফিডার লাইনস ডিএমসিসি–র বাংলাদেশ প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান রিজেন্সি লাইনস লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আনিস উদ দৌলা বলেন, ‘আগে করাচি থেকে সরাসরি চট্টগ্রামে পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ১২ দিন লাগত। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর হয়ে আসতে ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়নি, তবে এখন বিকল্প বন্দর ব্যবহার করে চালান আনা হচ্ছে।’
সরাসরি নৌ-পরিবহন সেবা কবে পুনরায় চালু হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে। কারণ পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশই পোশাক ও চামড়া শিল্পের কাঁচামাল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে আমদানি হওয়া অন্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে সোডিয়াম কার্বোনেট, ডলোমাইট, চুনাপাথর, ম্যাগনেসিয়াম কার্বোনেট, ভাঙা কাচ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, সুতা, কাপড়, ক্লিংকার, ফলমূল, পেঁয়াজ, শুকনো ফল এবং পোশাক।
অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে রপ্তানি করা হয় কাঁচা পাট, ওষুধ, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, চা এবং তৈরি পোশাক।
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি পণ্যের শতভাগ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার নিয়ম প্রত্যাহার করার পর সরাসরি নৌ-পরিবহন সেবার পথ উন্মুক্ত হয়। একই বছরের ১১ নভেম্বর পাকিস্তান থেকে প্রথম সরাসরি কনটেইনারবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়।
ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের কারণে প্রথমে একটি এবং পরে দুটি জাহাজ দিয়ে নিয়মিত সেবা পরিচালনা করা হয়, যা ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পাকিস্তান থেকে ১৯ কোটি ৩৩ লাখ ৯০ হাজার কেজি পণ্য আমদানি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল সাত হাজার ৭৭ কোটি টাকা। ২০২২ সালে আমদানির পরিমাণ কমলেও মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৫০১ কোটি টাকায়।
২০২৪ সালে আমদানির পরিমাণ সর্বোচ্চ ২০ কোটি ৫০ লাখ কেজিতে পৌঁছায় এবং এর মূল্য ছিল ১০ হাজার পাঁচ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে আমদানির পরিমাণ কমে সাত কোটি ৬৩ লাখ কেজিতে নেমে এলেও মূল্য সামান্য বেড়ে ১০ হাজার ১৮ কোটি ৭১ লাখ টাকায় দাঁড়ায়, যা উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানির প্রবণতা নির্দেশ করে।
চলতি বছরের ২৪ মে পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে ৩১ কোটি সাত লাখ কেজি পণ্য আমদানি হয়েছে, যার মূল্য প্রায় চার হাজার ১০৩ কোটি টাকা।
বাণিজ্য সম্প্রসারণে পরিবহন ব্যয় কমানো জরুরি উল্লেখ করে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি -এর সভাপতি ও সিকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘সরাসরি শিপিং সেবা আমদানি ও রপ্তানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। তবে বাণিজ্যের পরিমাণও বাণিজ্যিক সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে।’
সরাসরি সমুদ্রপথে সংযোগ পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় ব্যবসায়ীরা এখনও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প রুটের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।


