জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সরকার বাস ভাড়া যতটা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, মাঠ পর্যায়ে আদায় করা হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে। সরকার যে হারে ভাড়ার ঘোষণা দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি আদায় হতো আগেই। এখন যাত্রীরা ঠকছে আরও বেশি।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১১ পয়সা করে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, যা শতকরা হারে মহানগর ও আন্তঃনগরে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ।
তবে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সর্বোচ্চ ৬৪ পয়সা আর আন্তঃজেলায় মন্ত্রীর এই ঘোষণার আগেই কিলোমিটারে ৬০ পয়সা পর্যন্ত ভাড়া বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বরাবরের মতো যাত্রীরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।
জাকিরুর রহমান নামে এক যাত্রী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বেশি কমের কিছু নাই। যেতে হবে। তেলের যে অবস্থা যাওয়া যে যাচ্ছে, সেটাই বেশি।’
যাত্রী অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক খান টাইমসকে বলেন, ‘এর আগেও এমন হয়েছে। মন্ত্রীরা সব সময় বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আগেও কখনও কিছু করা হয়নি। এবারও হবে কি না জানি না।’
সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই হুঁশিয়ারি এসেছে। সড়ক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ‘এই সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় যদি বাস মালিকরা করতে চেষ্টা করে, ডেফিনেটলি বাস মালিকদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান এবং শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশে ডিজেলের দর বাড়ানো হয়েছে লিটারে ১৫ টাকা। ১০০ টাকা লিটারের তেল এখন কিনতে হচ্ছে ১১৫ টাকা।
এই দর ২০২২ সালের ৬ আগস্টের দর ১১৪ টাকা থেকে কেবল এক টাকা বেশি। আর সে সময় সরকার তেলের দাম বাড়ানোর কারণে যে ভাড়া নির্ধারণ করেছিল, তেলের দাম কমার পরেও সেই একই হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
ধাপে ধাপে তেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা কমার পর বাস ভাড়া সরকার কখনও কিলোমিটারে ২ পয়সা, কখনও ৩ পয়সা করে কমায়। কিন্তু সেটি কার্যকর আর হয়নি। কিন্তু এখন তেলের দাম আগের পর্যায়ে যাওয়ার পর বাস ভাড়া এখান থেকে লাফ দিয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত কী
সড়ক মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৫৩ পয়সা।
দূরপাল্লার পথে বাসভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা হয়েছে।
আর ঢাকার আশপাশে প্রতি কিলোমিটার বাস ভাড়া ২ দশমিক ৩২ টাকা থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪৩ টাকা হয়েছে।
এই হিসেবে নগর পরিবহনের ভাড়া ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দূরপাল্লার বাস ভাড়া ৫ দশমিক ১ শতাংশ বাড়ল।
দূরপাল্লায় বাসের এই ভাড়া ঘোষণা করা হয় ৫১ আসন হিসেবে। যাত্রীর সাচ্ছন্দ্যের জন্য আসন কমানো হলে আনুপাতিক হারে ভাড়া বাড়ানো যাবে।
কিন্তু ঢাকা বা আন্তঃজেলা দুই জায়গাতেই এর চেয়ে বেশি হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সেগুলোর সমাধান সরকার করতে পারেনি কখনও।
ঢাকায় ৩০ টাকার ভাড়া এখন ৪০
মোহাম্মদপুরের বসিলা থেকে উত্তরার আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত যাত্রী বহন করা পরীস্থান ও প্রজাপতি পরিবহনে স্টপেজ ভেদে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ১০ টাকা পর্যন্ত।
মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুরের ইসিবি চত্বর পর্যন্ত ৪০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা, বেড়েছে ২৫ শতাংশ। এই পথে কিলোমিটারে ভাড়া বেড়েছে ৬৪ পয়সা হারে।
অথচ নির্ধারিত ভাড়া হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ৪০ টাকা। বেশি নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা। আগের হারেই এই রুটে বেশি নেওয়া হতো ৩ টাকা।
আর আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত ৬০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৭০ টাকা, বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। বিআরটিএর চার্ট অনুযায়ী এই পথের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার, ভাড়া হওয়া উচিত ৬৩ টাকা। বেশি নিচ্ছে ৭ টাকা। আগে বেশি নেওয়া হতো না।
অর্থাৎ এই পথের যে দূরত্ব, তাতে ঘোষিত হারে ভাড়া আদায় করলে আসলে তা কমার কথা।
মোহাম্মদপুর থেকে ধূপখোলা পর্যন্ত মালঞ্চ পরিবহনে ভাড়া আদায় করা হতো ৪০ টাকা, সেটি এখন নেওয়া হচ্ছে ৪৫ টাকা। বেড়েছে ৫ টাকা বা সাড়ে ১২ শতাংশ।
সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর চার্ট অনুযায়ী এই পথের দূরত্ব ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার। নতুন হারে ভাড়া হয় ৩৭ টাকা। আগে বেশি নেওয়া হতো ৫ টাকা, এখন বেশি নেওয়া হচ্ছে ৮ টাকা।
ঢাকা-বরিশাল রুটে বেড়েছে ৬০ পয়সা পর্যন্ত
সরকার নতুন ভাড়া ঘোষণার আগ থেকেই বরিশাল-ঢাকা রুটে অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে।
আগের চেয়ে আসন প্রতি কোম্পানিভেদে বাড়ানো হয়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
লঞ্চভাড়াও ১০০ টাকা থেকে শুরু করে প্রকারভেদে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বাস মালিকরা স্বীকার করেছেন, বুধবার থেকেই তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন। আর লঞ্চ মালিকদের দাবি, তারা আগে কম নিতেন, আগের সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছেন।
নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সাকুরা, হানিফ, লাবিবা, এনা, বিএমএফ, শ্যামলীসহ অন্তত ১০টি কোম্পানির বাস ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ১৬৫ কিলোমিটার পথের ভাড়া এতদিন ছিল ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। এখন সেটি নেওয়া হচ্ছে ৬০০।
অর্থাৎ যারা ৫০ টাকা বাড়িয়েছে, তারা কিলোমিটার প্রতি ৩০ পয়সা এবং যারা ১০০ টাকা বাড়িয়েছে তারা বাড়িয়েছে ৬০ পয়সা।
সাইফুল ইসলাম নামে এক যাত্রী বলেন, ‘আগেই তারা প্রতি কিলোমিটারে ৬০ পয়সা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সরকার কি কিছু করতে পেরেছে? কখনই পারে না।’
আল মামুন নামে এক যাত্রী টাইমসকে বলেন, ‘তেলের দাম কমলে ভাড়া আর কমানো হয় না। সুতরাং এটা মালিক সমিতির একটা স্বেচ্ছাচারিতা।’
যে বাসগুলো ৫১ আসন থেকে ৪০ আসন করেছে, নিয়ম অনুযায়ী টোল ছাড়া তারা ভাড়া আদায় করতে পারবে ২ টাকা ৭২ পয়সা হারে। এই হারে ভাড়া হতে পারবে ৪৫০ টাকা। সেই সঙ্গে বড় বাসে পদ্মা সেতুতে ২৪০০ এবং এক্সপ্রেস ওয়ের ৫৫০ টাকা টোল হিসাব করে আদায় করা যাবে সর্বোচ্চ ৫২৫ টাকা।
আগে থেকেই ২৫ টাকা বেশি নেওয়া বাসগুলো এখন বেশি নেবে ৭৫ টাকা।
পরিবহন কোম্পানির কর্মীরা অবশ্য এসব হিসাবের ধার ধারেন না।
সাকুরা পরিবহনের বরিশাল কাউন্টারের ব্যবস্থাপক আনিসুর রহমান আনিস বলেন, ‘আমরা ৫০ টাকা ভাড়া বাড়িয়েছি। এতে প্রতি কিলোমিটারে ৩০ পয়সা করে ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।’
ঘোষণার আগেই বাড়িয়েছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বেড়েছে, তাই ভাড়া বৃদ্ধি করে দিয়েছি। এতে ঘোষণার কোনো প্রয়োজন নেই।’
হানিফ পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম খানও বলেন, ‘আমরা মালিকের নির্দেশে ভাড়া বৃদ্ধি করেছি। বিআরটিএ কোনো সিদ্ধান্ত দিয়েছে কি না, তা আমাদের জানা নেই।’


