মেহেরপুরে পোকার আক্রমণে মারা যাচ্ছে শত শত তালগাছ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তালগাছের ভূমিকা রয়েছে অনেক। ঝড়-বাদল, ঘূর্ণিঝড় কিংবা কালবৈশাখির সময় তালগাছ প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি ভূমিক্ষয় রোধ, মাটির উর্বরতা বজায় রাখা এবং ভূগর্ভস্থ পানির মজুত বৃদ্ধি করতেও এ গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এসব দিক বিবেচনায় মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে অসংখ্য তালগাছ রোপণ করা হয়েছিল। কয়েক বছরের পরিচর্যায় গাছগুলো বড় হয়ে ওঠে এবং এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও অবদান রাখতে শুরু করে।
কিন্তু সম্প্রতি রেড পাম উইভিল বা গুবরে পোকার আক্রমণে একের পর এক তালগাছ মারা যেতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০টি গাছ মারা গেছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও হাজারো গাছ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক তালগাছের কাণ্ডে ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। কোথাও কাণ্ডের ভেতর থেকে ঝুরঝুরে গুঁড়ার মতো ময়লা বের হচ্ছে। আক্রান্ত গাছের গোড়ায় লাল, কালো ও সাদা রঙের পোকা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি রেড পাম উইভিল। এই পোকা সাধারণত তাল ও খেজুর জাতীয় গাছের নরম অভ্যন্তরীণ অংশে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা বের হলে তারা গাছের ভেতরের অংশ খেতে থাকে। ফলে গাছের ভেতর ফাঁপা হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে গাছ শুকিয়ে মারা পড়ে।
বৃক্ষপ্রেমী ওয়াসিম সাজ্জাদ লিখন জানান, দুই-তিন মাস আগে প্রথম কয়েকটি গাছ শুকিয়ে যেতে দেখা যায়। তখন কারণ বুঝতে না পেরে কৃষি অফিস ও বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু এরই মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা নিজের সন্তানের মতো করে গাছগুলো লালন করেছি। কয়েক বছরের পরিশ্রমে এগুলো বড় হয়েছে। এখন চোখের সামনে গাছগুলো মারা যেতে দেখে খুব কষ্ট লাগছে। দ্রুত বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’
স্থানীয় কৃষক আবুল হাসেম জানান, তালগাছ আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তালের রস, শাঁস ও পাকা তাল গ্রামীণ অর্থনীতির একটি অংশ। পাশাপাশি ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে গ্রামকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু হঠাৎ করে গাছ মরে যাচ্ছে–এটা আমাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, রেড পাম উইভিল সাধারণত চার থেকে ছয় বছর বয়সী গাছে বেশি আক্রমণ করে। গাছের নরম অংশ খেয়ে ফেলার কারণে বাইরে থেকে শুরুতে তেমন বোঝা যায় না। যখন লক্ষণ স্পষ্ট হয়, তখন অনেক সময় গাছ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে তিনি আশ্বস্ত করে জানান, এ পোকার প্রতিকার রয়েছে। আক্রান্ত গাছে বিশেষ ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ, ফাঁদ স্থাপন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মেহেরপুর বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হামিম হায়দার জানান, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত সরেজমিনে তদন্ত করা হবে।
তিনি জানান, তালগাছ সাধারণত সহজে মারা যায় না। রেড পাম উইভিলের আক্রমণ হলে বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। অতীতে বিষ প্রয়োগের কারণেও কিছু গাছ মারা গিয়েছিল। প্রয়োজনে আমরা বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নেব।
মেহেরপুর গাংনী ডিগ্রি কলেজের সাবেক ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানের শিক্ষক এনামুল আজিম মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন কীটপতঙ্গের আক্রমণ বেড়েছে। তাই শুধু আক্রান্ত গাছের চিকিৎসা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও প্রয়োজন। নিয়মিত মনিটরিং, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া এই সমস্যা সমাধান কঠিন হবে।
স্থানীয়রা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সড়কের পাশে গড়ে ওঠা সবুজ বেষ্টনী ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এলাকাবাসী আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে জানান তারা।


