পাঁচ বছরের মধ্যে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, কম মূল্যস্ফীতি, বাড়তি বিনিয়োগ ও শক্তিশালী রাজস্ব কাঠামোর পথে নেওয়ার রূপরেখা তৈরি করেছে বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সোমবার অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় রূপরেখাটি উপস্থাপন করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি পৌঁছাবে ট্রিলিয়ন-ডলারের পথে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে, বিনিয়োগ উঠবে জিডিপির ৪০ শতাংশে, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত পৌঁছাবে ১১ শতাংশে এবং মূল্যস্ফীতি নেমে আসবে ৫ শতাংশে।
কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের সংকট, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে দাঁড়িয়ে এই পরিকল্পনা উচ্চাভিলাষী।
‘পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশল (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১)’ নামের পরিকল্পনাটিতে বলা হয়েছে, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সমাপ্তি, ভঙ্গুর অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং পূর্ববর্তী পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে নতুন এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারকে বাস্তবায়নযোগ্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপে রূপান্তরের কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে। একই সময়ে বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে উঠবে। মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশে নেমে আসবে। রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হবে ১১ শতাংশ। অথচ একই সময়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৩৯ শতাংশে স্থিতিশীল থাকবে বলে ধরা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই চারটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, সাধারণত উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও বড় বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সময়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, আমদানি বাড়ে এবং রাজস্ব কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের মতো দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অর্থনীতিতে একই সময়ে মূল্যস্ফীতি কমানো, রাজস্ব বাড়ানো ও প্রবৃদ্ধি দ্রুত ত্বরান্বিত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক সংঘাত চলছে, জ্বালানি সংকট রয়েছে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো চাপে আছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল এবং ঋণের বোঝাও বাড়ছে।’
তবে তিনি আশা করেন, ‘সরকার যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও পরিকল্পিত সংস্কারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে পারে, তাহলে এই লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হতে পারে।’
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনাগুলোতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়। প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার ওপর অতিরিক্ত জোর না দিয়ে পরিকল্পনায় গৃহীত নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’
পাঁচ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন-ডলার ট্র্যাজেক্টরিতে নেওয়া হবে। প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হবে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও ধরা হয়েছে।
কিন্তু বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাই হলো আস্থার সংকট।
এদিকে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ঘনঘন নীতি পরিবর্তন, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ও ভঙ্গুর কর ব্যবস্থাপনার মধ্যে বড় বিনিয়োগ আসবে কীভাবে, সেই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পরিকল্পনায় নেই।
ব্যাংক খাতের সংকটকে অর্থনীতির ভঙ্গুরতার অংশ হিসেবে এই পরিকল্পনাপত্রে স্বীকার করা হলেও খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকে পুনরায় মূলধন সরবরাহ, প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বা ব্যাংক রেজল্যুশনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নেই।
বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণ সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ঋণের সীমা বাড়ানো, খেলাপিদের নীতি সহায়তা বাড়ানো এবং ঋণ পুনঃতফসিল সহজ করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব বাস্তবতায় ব্যাংক খাত সংস্কার ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য টেকসই হবে না।
‘সরকারের লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষকে বসাতে হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে,’ বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুমানা হক।
পরিকল্পনাটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকার চায় পরবর্তী পাঁচ বছরে রাজস্ব আয়ের অনুপাত জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করতে। এজন্য কর সংস্কার, প্রশাসনিক পরিবর্তন, ডিজিটাল সমন্বয়, কর অব্যাহতি কমানো এবং ‘ট্যাক্স কালচার’ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই একই ধরনের কর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। ভ্যাট অটোমেশন, আয়কর নেট সম্প্রসারণ, বড় কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কিংবা কর প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি–কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব বাড়াতে ব্যর্থ হলে পুরো পরিকল্পনার আর্থিক কাঠামো চাপের মুখে পড়বে। তখন সরকারকে হয় বেশি ঋণ নিতে হবে, নয়তো ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অর্থায়নের দিকে যেতে হবে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম টাইমসকে বলেন, ‘আর্থিক খাত এমন এক অবস্থায় রয়েছে যেখানে এটিকে কীভাবে টেকসই করা হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নেই। সংস্কার আনতেই হবে। আমাদের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। একটি সঠিক রোডম্যাপ থাকলে অন্তত বোঝা যাবে যে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথ কোনদিকে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশ ধারাবাহিকভাবে এগোতে পারবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।’
পরিকল্পনায় উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, কৃষির রূপান্তর, এসএমই অর্থায়ন, ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মারস কার্ড, গ্রামীণ পর্যটন, ব্লু ইকোনমি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিকল্পনার এই অংশ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি সরাসরি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু অতীতে বাংলাদেশে স্বল্পসুদের পুনঃঅর্থায়ন, ভর্তুকিনির্ভর ঋণ ও বিশেষ তহবিলের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও ঋণখেলাপির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পরিকল্পনায় রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জুয়েলারি, আইসিটি ও ইলেকট্রনিকস খাতকে নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য কূটনীতি ও শিল্প নীতির বড় পরিবর্তন ছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে।
একইভাবে পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ঋণ-জিডিপি অনুপাত স্থিতিশীল থাকবে এবং ঋণ পরিশোধের চাপ ধীরে ধীরে কমবে। তবে উচ্চ উন্নয়ন ব্যয়, কম সুদের রাজনৈতিক প্রকল্প, ভর্তুকি ও ধীর রাজস্ব প্রবৃদ্ধির মধ্যে এই হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সর্বশেষ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও উচ্চ প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির উচ্চ লক্ষ্য ছিল। কিন্তু ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও নীতি অস্থিরতায় শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিতে বিপর্যয় ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর গত ১৪ মে এক অনুষ্ঠানে বলেন, পূর্ববর্তী উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো মূলত ‘মৃত ডকুমেন্টে’ পরিণত হয়েছিল।
তিনি বলেন, বিগত সরকার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্বল পরিকল্পনার মাধ্যমে অবাস্তব সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল, যা অর্থনীতিকে সংকটে ফেলেছে।


