কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি মালামাল চুরির নাটক সাজিয়ে তা বিক্রির তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিভাগীয় গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ মালামাল নিখোঁজ হওয়ার পরও কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের না করায় এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
একই সাথে আদালত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কেবল একটি লিখিত অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে পুলিশ হেফাজত থেকে উদ্ধারকৃত মালামাল ফেরত নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তি গায়েব করার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সাথে পুলিশের যোগসাজশ থাকতে পারে।
এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ এপ্রিল রৌমারীর একটি বিভাগীয় গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ মালামাল নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ হওয়া মালামালের মধ্যে ইউনিসেফের লোগোযুক্ত ২০ লিটারের ১১০টি বালতি ও ঢাকনা, ১০ লিটারের ২৯০টি জেরিকেন, ৪টি সিলিং ফ্যান, ৪০০টির বেশি হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং ৪০০টির বেশি ন্যাপকিন ছিল।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এই মালামাল গায়েব হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়লেও ঘটনার ১৪ দিন পর ১ মে রৌমারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
জিডি করার পর পুলিশ রৌমারী বাজারের আব্দুস সালাম, আব্দুল মালেক, শাহিদুর রহমান, মনজুর আলম ও প্রদীপ চন্দ্রের হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে বালতি, জেরিকেন এবং কিছু যন্ত্রপাতি উদ্ধার করে।
তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো নিয়মিত ফৌজদারি মামলা না করেই গত ৪ জুন একটি লিখিত অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে উদ্ধারকৃত মালামাল থানা থেকে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, উপ-সহকারী প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম নিজেই সরকারি মালামাল বিক্রি করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঘটনাটি জানাজানি হয়ে গেলে তিনি বিষয়টিকে চুরি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। ওই সূত্র মতে, লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে থানায় একটি জিডি করা হয়েছিল এবং বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই পরে উদ্ধারকৃত মালামাল ফেরত নেওয়া হয়।
কোনো মামলা কেন করা হয়নি জানতে চাইলে তারিকুল ইসলাম জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে রাজি ছিল না।
সাংবাদিকরা জিডির একটি কপি দেখতে চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে যে নির্দেশ দেবে, আমি তা পালন করতে বাধ্য। আপনারা যা খুশি লিখতে পারেন।’
তবে তার এ বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন কুড়িগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ।
তিনি বলেন, ‘আমি তাকে স্পষ্টভাবে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছিলাম। সে কেন মামলা করতে ব্যর্থ হলো, আমি তাকে জিজ্ঞেস করব এবং সেই অনুযায়ী আপনাদের জানাব।’
থানা থেকে ফেরত নিয়ে আসা উদ্ধারকৃত মালামালের ছবি তুলতে গেলে গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এক পর্যায়ে তিনি সাংবাদিক সাখাওয়াত হোসেনের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে উপস্থিত অন্য সাংবাদিকদের বাধায় তিনি সফল হননি।
আদালতের অনুমতি ছাড়া উদ্ধার হওয়া চুরির মালামাল ফেরত দেওয়া যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কাওসার আলী জানান, বিষয়টি যখন জিডির মাধ্যমে নথিবদ্ধ থাকে, তখন পুলিশ একটি লিখিত অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে উদ্ধারকৃত মালামাল জিম্মাদারের কাছে হস্তান্তর করতে পারে।
রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, কোনো ফৌজদারি মামলা না করার বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা চাইবেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।


