সমুদ্রের গভীর তলদেশে লাখো বছর পুরোনো এক তিমির কবরস্থান খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সেই কবরস্থানের ওপর শত শত বছর ধরে বিকশিত সামুদ্রিক প্রাণীর বিস্ময়কর সম্প্রদায়েরও খোঁজ মিলেছে। তিমির কবরের ওপর জেলিফিশ, নলাকৃতির কৃমি এবং ভঙ্গুর প্রজাতির স্টারফিশসহ (তারামাছ) নানা ধরনের প্রাণী সহবস্থান করছে।
দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৩ হাজার ফুট বা সাত কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত এই কবরস্থান এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে প্রাচীন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
সাধারণত এ ধরনের কবরস্থান তৈরি হয় যখন মৃত তিমির দেহ সমুদ্রের তলদেশে ডুবে যায় এবং গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যের উৎসে পরিণত হয়।
চীনের বিজ্ঞান একাডেমির গভীর সমুদ্রবিজ্ঞান ও প্রকৌশল ইনস্টিটিউটের জীববিজ্ঞানী শিকুন সুংয়ের মতে, তিমির বিশাল আকার এবং বিশেষ রাসায়নিক গঠনই পানির নিচের এমন অনন্য জীববৈচিত্র্যপূর্ণ আবাস গড়ে ওঠার মূল কারণ।
এক ইমেইল বার্তায় তিনি বলেন, ‘গভীর সমুদ্রের প্রকৃতিই এমন যে এসব স্থান বিজ্ঞানীদের জন্য খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন।’
গবেষকরা ২০২৩ সালে গভীর সমুদ্রে পরিচালিত একাধিক ডুবযান অভিযানের মাধ্যমে তিমির দেহাশেষগুলো খুঁজে পান। সে সময় তারা পরবর্তী গবেষণার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন এবং পুরো কবরস্থানের মানচিত্র চিহ্নিত করেন।
তারা কবরস্থানটিতে অন্তত পাঁচটি তিমির মৃতদেহের স্থান এবং বিভিন্ন জীবাশ্মের সন্ধান পান। এর মধ্যে বিভিন্ন জাতের তিমির খুলি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কবরস্থানে থাকা তিমির দেহাবশেষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো অস্থিগুলোর বয়স প্রায় ৫৩ লাখ বছর।
এই মৃতদেহ ও অস্থিগুলোর ওপর নির্ভর করে অসংখ্য বড় ও ছোট প্রাণী বসবাস করছে। এর মধ্যে রয়েছে সি কিউকাম্বার (সমুদ্র শসা), খাটো আকৃতির গলদা চিংড়ি এবং সামুদ্রিক ঝিনুকজাতীয় প্রাণী।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব প্রাণীর অনেকগুলোই এমন বিরল প্রজাতি, যেগুলোর অস্তিত্ব এর আগে কখনও বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত হয়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ক্যালভার্ট সামুদ্রিক জাদুঘরের জীবাশ্মবিজ্ঞানী স্টিফেন গডফ্রে বলেন, ‘লাখ লাখ বছরের পুরনো এতো নমুনার সংখ্যা সত্যিই বিস্ময়কর।’
গবেষকদের মতে, কয়েকটি কারণ মিলেই অস্থিগুলোকে লাখো বছর ধরে সংরক্ষিত থাকতে সাহায্য করেছে। তিমির অস্থিগুলো এতটাই ঘন যে অস্থিভোজী কৃমির আক্রমণেও সেগুলো সহজে ক্ষয় হয়নি। এগুলো সমুদ্রের এত গভীরে অবস্থান করছিল যে ধুলাবালি ও ভাসমান কণার নিচে চাপা পড়েনি।
এ ছাড়া চারপাশের সমুদ্রের পানিতে থাকা খনিজ পদার্থের পাতলা আবরণ অস্থিগুলোর ওপর জমে ছিল, যা সেগুলোকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয় হওয়া থেকে রক্ষা করে থাকতে পারে।

একই স্থানে এত তিমির মৃত্যু কেন হয়েছিল, সে প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজেছেন গবেষকরা।
তাদের ধারণা, তিমিগুলো হয়তো ওই এলাকাতেই বসবাস করত এবং স্বাভাবিক কারণেই মারা গেছে। কিছু তিমি গভীর সমুদ্রে ডুব দেওয়ার ফলে ক্লান্তি বা অসুস্থতার কারণেও মারা যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, ওই সামুদ্রিক এলাকার ভূ-প্রকৃতি ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো হওয়ায় মৃতদেহগুলো চারপাশ থেকে একই স্থানে এসে জমা হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায়-পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম ও কঠিন পরিবেশেও প্রাণের বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায় টিকে থাকার পথ খুঁজে নেয়।
গবেষণার সহলেখক এবং ইতালির পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিজ্ঞানী জিওভান্নি বিয়ানুচ্চি এক ই-মেইল বার্তায় বলেন, ‘তিমির কবরস্থান নিয়ে গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে প্রাণীজগৎ এমন চরম পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। সেখানে শুধু আলো ও অক্সিজেনের ঘাটতিই নয়, বরং অত্যন্ত উচ্চ চাপও বিদ্যমান থাকে।’
সূত্র: এপি


