ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৬টি ছোট সমমনা দলের জন্য ২৭টি নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে বিএনপি। মূলত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে নিজেদের ভিত্তি শক্তিশালী করতেই আসন ছেড়ে দেওয়ার মতো বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।
দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোনয়ন বোর্ড এখন আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
অবশ্য এখনো কিছু সহযোগী ও সমমনা দল তাদের নির্বাচনী অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। লাভ ক্ষতির সমীকরণে তারা এখনো অবস্থান পরিষ্কার করছে না।
বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে প্রায় ৫০টি দল যোগ দিয়েছিল। এগুলোর মধ্যে যে দলগুলোর নেতাদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের জন্যই আসন ছেড়ে দেওয়া হবে। দলগুলোর দাবি ও অবস্থান বুঝতে জন্য আগামী সপ্তাহে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে বলেও জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
গত মঙ্গলবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আসন ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও বৈঠকের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
অন্য কার সঙ্গে জোট হচ্ছে তা ঠিক না হলেও এখন পর্যন্ত এটুকু নিশ্চিত যে জামায়াতের সঙ্গে আর জোটে যাচ্ছে না বিএনপি। জামায়াত যেমন সমমনাদের নিয়ে জোট গোছানোর পরিকল্পনা করছে, বিএনপিও একই পথে হাঁটছে।
বিএনপির সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে যাচ্ছেন কিনা, তা জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি এবং গণতান্ত্রিক মঞ্চের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার দিক থেকে আমরা বিএনপির কাছাকাছি। আমরা আগেও তাদের সঙ্গে কাজ করেছি। তবুও অনেক হিসাব-নিকাশ আছে, তাই আমরা জোটে যোগ দেব কিনা তা বলার সময় এখনো আসেনি।’
১২-দলীয় জোট এবং সমমনা দলগুলোর জোট অতীতের আন্দোলনগুলোয় বিএনপির সঙ্গে ছিল।
বিএনপির অন্য সমমনা মধ্যে রয়েছে-কর্নেল অলি আহমেদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ববি হাজ্জাজের ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম), আন্দালিব রহমান পার্থের বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), নুরুল হক নুরের গণ অধিকার পরিষদ, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং আ স ম আবদুর রব ও মান্নার নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্র মঞ্চ।
বিএনপি আসন ভাগাভাগি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিটি দল এবং তার নেতাদের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ভালোভাবে খতিয়ে দেখছে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন ধরে মাঠে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন করা হবে। যদিও আসন ভাগাভাগি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, আলোচনা চলছে।’
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিকভাবে অলি আহমেদের এলডিপির জন্য তিনটি আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অলি আহমেদের জন্য চট্টগ্রাম-১৪, সাধারণ সম্পাদক ড. রেদোয়ান আহমেদের জন্য কুমিল্লা-৭ এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুল আলম তালুকদারের জন্য চট্টগ্রাম-৭।
গণ অধিকার পরিষদ দুটি নির্বাচনী এলাকা পেতে পারে—সভাপতি নুরুল হক নুরের জন্য পটুয়াখালী-৩ এবং সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানের জন্য ঝিনাইদহ-২। এনডিএম-এর পক্ষে ববি হাজ্জাজ ঢাকা-১৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন আর বিজেপি সভাপতি আন্দালিব পার্থ ঢাকা-১৭ এবং এর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সাউদ ঢাকা-৫ পেতে পারেন।
বিএনপি ১২-দলীয় জোটের পাঁচটি দলের জন্য সাতটি আসন প্রস্তাব করেছে। এগুলো হলো জাতীয় পার্টি (জাফর) এবং মুফতি মহিউদ্দিন ইকরামের নেতৃত্বাধীন জমিয়ত উলামা ইসলামের জন্য দুটি করে এবং বাংলাদেশ জাতীয় দল, বাংলাদেশ এলডিপি এবং ইসলামী ঐক্যজোটের জন্য একটি করে।
এদের মধ্যে জাতীয় পার্টি (জাফর)-এর চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার পিরোজপুর-১ এবং সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব লিংকনের জন্য কুষ্টিয়া-২ আসন ছেড়ে দেওয়া হবে।
জাতীয়তাবাদ সমমনা জোট থেকে, নড়াইল-২ আসন এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের জন্য রাখা হবে বলে জানা গেছে।
গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে চারজন প্রার্থীর কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এরা হলেন জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য বগুড়া-৪, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা সাইফুল হকের জন্য ঢাকা-৮ এবং গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬- আসন।
লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকেও পিরোজপুর-২ আসনে সমর্থন দিতে রাজি হয়েছে বিএনপি।
অবশ্য জোট গঠনে বা আসন ভাগাভাগিতে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
কারণ গণতন্ত্র মঞ্চ এখনও নিশ্চিত করেনি যে তারা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হবে কিনা। এমনকি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলির অবস্থানও অস্পষ্ট।
গণ অধিকার পরিষদ, এবি পার্টি এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) একটি আলাদা জোটের খোঁজে রয়েছে। ফলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দলটি আমার বিষয়ে ইতিবাচক।’
ছোট ও বিএনপি সমমনা বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে টাইমস অব বাংলাদেশ কথা বলেছে।
তারা বলছেন, কয়েকটি বাদে, বেশিরভাগ দলেরই কোনো জোট ছাড়া নির্বাচন করলে জেতার সম্ভাবনা খুব কম। সে কারণেই তারা পরের নির্বাচনে সুযোগ নিশ্চিত করতে বিএনপির মতো একটি বড় দলে যোগ দিতে আগ্রহী।
অন্যদিকে , বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা মনে করেন- জামায়াতের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী নির্বাচনী অবস্থান সুসংহত করতে এই ছোট দলগুলো তাদের সাহায্য করবে।


