আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দূষণ, বন উজাড়, নদী দখল, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা দিয়ে আসছেন। একজন পরিবেশবাদী আইনজীবী এবং দীর্ঘদিনের সক্রিয় পরিবেশকর্মী হিসেবে সবাই আশা করেছিলেন, তিনি পরিবেশ নিয়ে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবে রূপ দেবেন। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও তার ঘোষণা এবং কাজের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখছেন সমালোচকরা।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সংকট
এই পার্থক্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। দায়িত্ব নেওয়ার পর রিজওয়ানা হাসান এই দ্বীপ নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন প্রবাল ধ্বংস করছে। পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিয়ে ২০২৫ সালের শুরুতে দ্বীপে পর্যটন প্রায় ৯ মাস বন্ধ রাখা হয়। এতে দ্বীপের পর্যটন–নির্ভর বাসিন্দারা চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন।
রিজওয়ানা হাসান দ্বীপবাসীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। ২০২৫ সালের শেষে দ্বীপটি পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও শুধু পর্যটক সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা প্রবাল রক্ষায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। পরিবেশবাদীদের মতে, সঠিক তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদী তদারকি ছাড়া দ্বীপটির উন্নতি হচ্ছে কি না তা বোঝার উপায় নেই।
প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধের প্রভাব
পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বন্ধে রিজওয়ানা হাসানের উদ্যোগও একই পথে হাঁটছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সুপারশপগুলোতে এটি সফলভাবে কার্যকর হলেও, তা বাজারে মোট ব্যবহারের দুই শতাংশেরও কম। সাধারণ কাঁচাবাজারে পলিথিনের ব্যবহার আগের মতোই রয়ে গেছে, যা মোট ব্যবহারের ৯৮ শতাংশেরও বেশি।
সরকারি তথ্যমতে, কোটি টাকার বেশি জরিমানা ও বিপুল পরিমাণ পলিথিন জব্দ করা হলেও ২০২৫ সালের শেষে এসে এই অভিযান ঝিমিয়ে পড়ে। কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, পাটের ব্যাগের দাম পলিথিনের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ তা কিনতে পারছেন না। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এই নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী হচ্ছে না।
বায়ু দূষণ ও ধুঁকতে থাকা ঢাকা
বায়ু দূষণে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শহর। ২০২৬ সালেও ঢাকার বাতাস “খুবই অস্বাস্থ্যকর” পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সীমার চেয়ে ঢাকার বায়ু দূষণ প্রায় ৪০ গুণ বেশি। কালো ধোঁয়া নির্গত করা যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও কোনো বড় প্রকল্প এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় “বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট” এখনো অনুমোদন পর্যায়ে আটকে আছে। জনবল সংকটের কারণেও এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
নদী দখল ও পাথর উত্তোলন
নদী দখলদারদের উচ্ছেদ ও নদী রক্ষার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে অগ্রগতি খুব কম। ঢাকার চারপাশের মাত্র চারটি নদীর জন্য পরিকল্পনা আছে, যার মধ্যে শুধু তুরাগ নদীর কাজ প্রাথমিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে ১৫টি নদী রক্ষার কথা বলা হলেও এখন তা কমিয়ে আনা হয়েছে। রিজওয়ানা হাসান এখন বলছেন, দখলদার উচ্ছেদের দায়িত্ব মূলত নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের। সমালোচকরা বলছেন, দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তিনি নিজের আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছেন।
অন্যদিকে, সিলেটে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধের দাবি করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। স্থানীয়দের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর জাফলং ও সাদা পাথর এলাকা থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে। রিজওয়ানা হাসান নিজেও স্বীকার করেছেন, অতীতে কর্মী হিসেবে যা পেরেছিলেন, উপদেষ্টা হিসেবে তা করতে পারছেন না।
শব্দ দূষণ, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা
পরিবেশ সংস্কারের দীর্ঘ তালিকায় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বন রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়টি বারবার আলোচনায় এলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন এখনো সামান্যই।
রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে ‘হর্নমুক্ত’ বা ‘শব্দহীন’ ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো বদল ঘটেনি। ঢাকার রাস্তায় এখনো ১২০ থেকে ১৩০ ডেসিবলের উচ্চশব্দসম্পন্ন নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন অবাধে বাজছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়মিত তদারকি ও জরিমানা করার জন্য পর্যাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে তদারকির অভাবে ঘোষণাগুলো কেবল কাগুজে সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
বনভূমি উদ্ধারের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু সফলতার দাবি করা হলেও বন বিভাগের তথ্য বলছে, এখনো দুই লাখ ৫৭ হাজার একরের বেশি বনভূমি প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবৈধ দখলে রয়ে গেছে। এনিয়ে রিজওয়ানা হাসানের মন্তব্য: ৫৪ বছরের পুরনো এই সমস্যার সমাধান মাত্র দেড় বছরে করা সম্ভব নয়।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও সরকারের ভূমিকা বড় প্রশ্নের মুখে। চুনতি ও কক্সবাজারে হাতির অভয়ারণ্য তৈরির জোরালো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। ফলে মানুষের সাথে দ্বন্দ্ব এবং ট্রেনের ধাক্কায় হাতি মৃত্যু বেড়েই চলেছে। সরকারি হিসেবেই গত দেড় বছরে দেশে অন্তত ২৫টি বন্য হাতি মারা গেছে। এ বিষয়ে উপদেষ্টার ভাষ্য, বনায়ন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল তৈরি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যার তাৎক্ষণিক সমাধান কঠিন।
প্লাস্টিক, নদী বা বন্যপ্রাণী—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাজেট ঘাটতি, জনবল সংকট এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে পরিবেশ উন্নয়নের বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিজওয়ানা হাসান নিজেও এসব সমস্যার কথা জানেন।
উপদেষ্টার সমর্থকরা বলছেন, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা সমস্যা সমাধানে সময় লাগবে। তবে সমালোচকদের মতে, টেকসই ব্যবস্থা না গড়ে শুধু বড় বড় কথা বলা বা প্রচারণামূলক কাজ কোনো সুফল আনবে না। একজন কর্মীর উদ্যম কি শেষ পর্যন্ত সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কাছে হার মেনে নেবে, নাকি পরিবর্তন আনবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।


