চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরের উপজেলা সন্দ্বীপ এখন দেশের সবচেয়ে কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল যাতায়াত রুটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। কেবল ১৩ কিলোমিটারের সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি দিতেই যাত্রীদের অনেক সময় পুরো দিন লেগে যায়।
বৈরী আবহাওয়া, উত্তাল সাগর, দুর্বল অবকাঠামো, অব্যবস্থাপনা এবং কথিত পরিবহন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের কারণে এ রুটে যাত্রা এখন বহু মানুষের কাছে নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।
ঈদুল আজহার ছুটির শুরুতেই পরিস্থিতি যেন আরও কঠিন হয়ে ওঠেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় হাজারও ঘরমুখী মানুষ সোমবার সকাল থেকেই বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাটে জড়ো হন।
এই রুটের সবচেয়ে দ্রুতগতির বাহন স্পিডবোট যাত্রীদের পছন্দের শীর্ষে থাকলেও উত্তাল সাগরের কারণে এদিন তা কার্যত বন্ধ ছিল। তুলনামূলক নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ফেরি এবং যাত্রীবাহী নৌযান জোয়ার-ভাটার সময়সূচি মেনে সীমিত পরিসরে চালু রেখে জরুরি যোগাযোগ টিকিয়ে রাখে কর্তৃপক্ষ। স্পিডবোটে সাধারণত সন্দ্বীপ চ্যানেলের ১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ২০ মিনিটের মতো সময় লাগে।
মঙ্গলবারও ফেরিঘাটে একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। সন্দ্বীপে প্রবেশের দুই পয়েন্ট কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়া ঘাটে বৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়ায় কয়েক হাজার যাত্রী আটকা পড়েন। স্পিডবোটসহ ছোট নৌযান চলাচলও বন্ধ আছে।
এতে প্রচণ্ড চাপ পড়ে জোয়ারের সময় চালু হওয়ার কথা থাকা ফেরি ও নৌযানের ওপর। অতিরিক্ত ভিড়ে টার্মিনালে হাজারও মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে থাকার শঙ্কা জানিয়েছেন।
সোমবার ফেরিঘাটে প্রায় ১০ হাজার যাত্রী অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের ফেরি এসটি কপোতাক্ষ এবং যাত্রীবাহী নৌযান এমভি মালঞ্চ ব্যবহার করে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। জোয়ার-ভাটার সীমাবদ্ধতার কারণে দুটি নৌযানই সারা দিনে কেবল দুইবার চলাচল করেছে।
বাঁশবাড়িয়া ঘাটে যাত্রীরা বিশৃঙ্খলা, ক্লান্তি ও অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরে ক্ষোভ জানান। নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীরা পর্যাপ্ত ওয়েটিং রুম কিংবা যাত্রী ছাউনি না থাকায় খোলা আকাশের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। বৃষ্টিতে ভিজেও অপেক্ষা করতে দেখা যায় অনেককে। এমনকি যাত্রীদের জন্য ঘাটে শৌচাগার বা খাবার পানির ব্যবস্থা নেই।
সন্দ্বীপগামী যাত্রী শেখ ফরিদ বলেন, ‘আমি সকাল ১১টার দিকে সন্দ্বীপ যাওয়ার জন্য টার্মিনালে আসি, কিন্তু ভাটার কারণে কোনো নৌযান ছাড়েনি। শেষ পর্যন্ত এমভি মালঞ্চ বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ছাড়ে। এর মধ্যে টার্মিনালে প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার যাত্রী জড়ো হয়েছিলেন। আমরা সন্ধ্যা ৭টার দিকে সন্দ্বীপে পৌঁছাই।’
‘এটা কোনো যাত্রা নয়, এটা শাস্তি’, ক্ষোভ জানান তিনি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন বাণিজ্য পরিচালক এস এম আশিকুজ্জামান জানান, করপোরেশন দেশের অন্তত ১০টি দ্বীপ রুটে চলাচল পরিচালনা করলেও সন্দ্বীপ রুটই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সমস্যাপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘সন্দ্বীপ চ্যানেলে একই সঙ্গে তীব্র নাব্যতা সংকট ও উত্তাল সাগর পরিস্থিতি থাকে। বছরের পর বছর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু রুটটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ রয়ে গেছে।’
কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ছোট কাঠের নৌকা, ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলার ও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই স্পিডবোটই দ্বীপের মানুষের একমাত্র যাতায়াত ভরসা ছিল। গত এক দশকে সন্দ্বীপ চ্যানেলে একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে একাধিক নৌকা ও স্পিডবোট দুর্ঘটনায় অন্তত কয়েক ডজন যাত্রী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর মাওয়া রুটে আগে চলাচল করা কয়েকটি অলস ফেরি বিশেষ সরকারি উদ্যোগে সন্দ্বীপ ও হাতিয়া দ্বীপের সঙ্গে ফেরি যোগাযোগ চালুর জন্য পুনর্বিন্যাস করা হয়। সেসব ফেরি চালু হওয়ায় নিরাপত্তা কিছুটা বেড়েছে।
তবে কর্তৃপক্ষও স্বীকার করছে, অসম্পূর্ণ অবকাঠামো নতুন ধরনের ব্যবস্থাপনা পরিবহনখাতে ব্যর্থতা তৈরি করেছে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী পোশাকশ্রমিক মোহাম্মদ মিশু বলেন ‘চট্টগ্রাম শহরের সাগরিকায় আমার কর্মস্থল থেকে সন্দ্বীপে বাড়ি ফিরতে আমাদের চার থেকে পাঁচবার পরিবহন বদলাতে হয়, একবার যেতেই প্রায় এক হাজার থেকে ১২শ টাকা খরচ হয়। কিন্তু প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের ঢাকা যেতে অনেক সময় এর অর্ধেক খরচ লাগে।’
জোয়ারের সময় সংযোগ পন্টুন সড়ক প্রায়ই পানির নিচে চলে যায়। কাজেই ভাটার সময় ফেরি ঠিকভাবে ঘাটে ভিড়তে পারে না। যাত্রীদের অনেক সময় কাদা, পানি ও অনিরাপদ অস্থায়ী কাঠামোর ওপর দিয়ে হেঁটে নৌযানে উঠতে হয়।
অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘টার্মিনাল অবকাঠামো ও সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্পগুলো পুরোপুরি শেষ হলে দুর্ভোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
এদিকে গত এক দশকে দীর্ঘ জেটি, ফেরি টার্মিনাল, সাগর বাঁধ সড়ক এবং একাধিক কাঠের অবতরণকেন্দ্রে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করার পরও কর্তৃপক্ষ নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ওঠানামার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি।
যাত্রীরা রুটটিতে শক্তিশালী পরিবহন সিন্ডিকেট থাকার অভিযোগও করেছেন। তারা জানান, একই পক্ষ স্পিডবোট ও নৌযান পরিচালনার ইজারা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে তারা লাভের সুযোগ অনুযায়ী সেবা চালু বা বন্ধ রেখে যাত্রীদের জিম্মি করতে পারে।
যাত্রী খাদেমুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘স্পিডবোট সিন্ডিকেট পুরো রুট নিয়ন্ত্রণ করে। আবহাওয়া সামান্য ভালো হলেই তারা বড় নৌযান বন্ধ রাখার চেষ্টা করে, যাতে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে স্পিডবোটে ওঠেন, যেখানে লাভ বেশি।’
‘যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে গৌণ হয়ে গেছে’, যোগ করেন তিনি।

আরেক যাত্রী নাসরিন আক্তার লাকি টার্মিনালে নারী ও পরিবারগুলোর অমানবিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য কোনো যথাযথ অপেক্ষার জায়গা নেই, ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার নেই এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ যাত্রীছাউনিও নেই। নারী ও শিশুদের অসহনীয় অবস্থার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এটা মানবিক সংকটের মতো মনে হয়।’
টার্মিনালের কুলিদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ করেন যাত্রী ওমর ফয়সাল । বলেন, ‘কুলিরা জোর করে যাত্রীদের লাগেজ ধরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হয়রানি করা হয়। তারপরও টার্মিনালে প্রায় কোনো নজরদারি বা ব্যবস্থাপনা নেই।’
স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় চার লাখ মানুষের আবাস সন্দ্বীপ এখনো মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য পুরোপুরি নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। দেশের স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও দ্বীপটিতে নিরাপদ ও আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের মতে, শুধু ফেরি চালু করলেই সংকটের সমাধান হবে না। গভীর সাগর উপযোগী জেটি, আধুনিক টার্মিনাল, বৈরী আবহাওয়া সহনশীল নৌযান, শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কাঠামোগত সংস্কার ও টেকসই বিনিয়োগ ছাড়া সন্দ্বীপ চ্যানেল দেশের উপকূলীয় জনপদের বিচ্ছিন্নতা, অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের প্রতীক হয়েই থাকবে বলেও সতর্ক করেন ভুক্তভোগীরা।


