দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে জায়গা সংকটে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে অফিস করতে বাধ্য হচ্ছেন কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। মাঝেমধ্যেই ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ায় সব সময় মানসিক আতঙ্কে থাকেন তারা।
প্রায় ৯০ বছর আগে নির্মাণ করা সচিবালয়ের এক নম্বর ভবনটি ২০১৭ সালে সক্ষমতা যাচাই করে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে ৫০ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিয়ে বড় আকারের সরকার গঠন করে বিএনপি। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সংখ্যা এবং প্রশাসনের কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের বসার জায়গার সংকট এখন তীব্র। মন্ত্রণালয়ে জায়গা না হওয়ায় বাধ্য হয়ে কিছু শাখা বা অধিশাখাকে সচিবালয়ের এই ঝুঁকিপূর্ণ এক নম্বর ভবনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে বুধবার ওই ভবনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আইন মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এসব দপ্তরের কর্মকর্তাদের মনে সারাক্ষণ ভবন ধসের আতঙ্ক কাজ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, সচিবালয়ের সামনের রাস্তা দিয়ে জোরে গাড়ি গেলেই ভবনটি কেঁপে ওঠে। এতে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেক সময় ভয়ে ও আতঙ্কে হাতের সামনে থাকা ফাইলও খুঁজে পান না তারা।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, মৌখিক আদেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কিছু কিছু শাখা বা অধিশাখাকে এক নম্বর ভবনে জায়গা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে তাদের সেখানে পাঠানো হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর নিজেদের দায় এড়ানোর সুযোগ নিতেই মৌখিক আদেশ দিয়েছে।
সচিবালয়ের এক নম্বর ভবনে আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অফিস করতেন। ২০১৭ সালে এই ভবনের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। সক্ষমতা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৩৭ সালে নির্মিত ভবনটির আয়ুষ্কাল পার হয়ে যাওয়ায় ভবনটির ভার বহনের ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-৯৩ অনুযায়ী, ভবনটির ভূমিকম্প সহনীয়তা আদর্শ মানের তুলনায় ২৫ শতাংশের কম। ওই প্রতিবেদনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।
এরপর ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৩ তলায় মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু করেন। পরে সচিবালয়ে নতুন ২০ তলা ভবন তৈরি হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন বিভাগকে সেখানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লাইব্রেরিসহ বেশ কিছু অফিস এখনো পুরোনো ভবনেই রয়ে গেছে।
২০১৭ সালের সক্ষমতা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ইস্তিয়াক আহমেদ জানান, ভবনটি অনেক পুরোনো হওয়ায় যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলে এই ঝুঁকির পরিমাণ আরও বাড়বে। তাই সরকারের উচিত যত দ্রুত সম্ভব সেখানে অফিসের সব কার্যক্রম বন্ধ করা।
সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শুধু এক নম্বর ভবনই নয়, এর কাছাকাছি সময়ে নির্মিত ২, ৩, ৫ ও ৮ নম্বর ভবনগুলোও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। সচিবালয়ের ২ ও ৩ নম্বর ভবনে বাণিজ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ৫ নম্বর ভবনে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অবস্থিত। ৮ নম্বর ভবনে রয়েছে স্বরাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয়। এসব ভবনের সক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা না হলেও সেগুলোও যথেষ্ট নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, দ্রুত এসব ভবনের সক্ষমতা যাচাই করা উচিৎ।
এদিকে সচিবালয়ে ২১ তলা বিশিষ্ট একটি নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে এই ভবন তৈরিতে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, পুরোনো এক নম্বর ভবন ভেঙে ঠিক সেই স্থানেই ২১ তলা ভবনটি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গত ৬ এপ্রিল একনেক সভায় ভবন নির্মাণের প্রস্তাবটি আলোচ্যসূচিতে থাকলেও তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। তবে আগামী ২৬ এপ্রিলের একনেক সভায় প্রকল্পটি পুনরায় এজেন্ডায় রাখা হয়েছে।
ভবন নির্মাণের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বর্তমানে সচিবালয়ে অফিস স্পেস আছে প্রায় ৯ লাখ ৯৯ হাজার বর্গফুট। তবে অতিরিক্ত চাহিদা রয়েছে আরও প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুটের। নতুন ভবনটি নির্মিত হলে চাহিদার প্রায় ৪২ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। এতে একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে একই ছাদের নিচে আনা যাবে, যা প্রশাসনিক সমন্বয় ও সেবা প্রদানে গতি বাড়াবে।
তবে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ২০২৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় লাগবে। অর্থাৎ, অন্তত আগামী চার বছর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই পুরোনো ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের ভেতরে ও সীমান্ত এলাকায় ৩২টি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এমন ভূমিকম্প সচিবালয়ের এই নড়বড়ে ভবনগুলোর জন্য বড় হুমকি।


