সংস্কার প্রশ্নে সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘গণভোটে জনগণের অনুমোদিত রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং দেশে আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদের পুরোনো ধারা ফিরে আসছে।’
শনিবার সকালে রাজধানীতে ‘সংস্কার অচলাবস্থা: উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক সংলাপে কূটনীতিক, হাইকমিশনার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আজকের আলোচনা কেবল রাজনৈতিক মতবিরোধ নিয়ে নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে। জুলাই বিপ্লবের আত্মত্যাগ গণতান্ত্রিক রূপান্তরে পৌঁছাবে, নাকি আবারও পুরোনো কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির চক্রে হারিয়ে যাবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।’
‘চব্বিশের জুলাই বিপ্লব ছিল “ঐতিহাসিক জাতীয় জাগরণ”, যেখানে ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ একটি “গভীরভাবে প্রোথিত কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার” বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল,’ যোগ করেন তিনি।
সেই শাসনব্যবস্থা ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করেছিল, নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছিল এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেছিল বলে মনে করেন বিরোধীদলীয় এই নেতা।
এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, ‘স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, নিপীড়নের শিকারদের বিচার এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের দায়িত্ব ছিল। আর এনসিপি শুরু থেকেই একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের পক্ষে অবস্থান নেয়।’
১৯৭২ সালের সংবিধান সময়ের সঙ্গে এমন এক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে, যা নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতা ও একদলীয় আধিপত্যকে উৎসাহিত করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তাই কাঠামোগত সাংবিধানিক সংস্কার ছাড়া গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপদতা আবারও ফিরে আসবে বলেই তারা বিশ্বাস করেন বলে জানান নাহিদ ইসলাম।
তবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির বিরোধিতার কারণে নতুন সংবিধানের প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
পরে সব রাজনৈতিক দল “জুলাই চার্টার”-এ একমত হয়, যেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নির্বাহী হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করেন এনসিপির এই নেতা।
তিনি বলেন, ‘পরে অনুষ্ঠিত জাতীয় গণভোটে জুলাই চার্টার ও ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব জনগণ অনুমোদন করে। এর মধ্যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া এবং উচ্চকক্ষ সম্পর্কিত আটটি মূল সংস্কার সরাসরি গণসমর্থন পেয়েছিল।’
নির্বাচনের আগে বিএনপি এই কাঠামো মেনে নিলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘সরকার সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং জনগণের অনুমোদিত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করেছে।’
মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতি দমন কমিশনের নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, গুম প্রতিরোধ, পুলিশি জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অধ্যাদেশ বর্তমান সরকার বাতিল করেছে বলেও অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
এসবের অনেকগুলোই আগে বিএনপির নিজস্ব অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘একদিকে সংস্কার উদ্যোগ বাতিল করা হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ায় এমন আইন বহাল রাখা হচ্ছে। এতে আবারও কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।’
সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে তিনি বলেন, সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ায় মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা ভবিষ্যতে নতুন সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। অতীতে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী পরবর্তীতে আদালত বাতিল করেছিল। প্রকৃত সাংবিধানিক সংস্কার হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তিতে।’
অর্থনীতি ও প্রশাসনের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব প্রশাসনে যে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার অনেকগুলো এখন পরিত্যক্ত।’
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের সাম্প্রতিক সংশোধনের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন এনসিপি প্রধান। তার মতে, যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশের আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট প্রকাশের অভিযোগে নাগরিকদের গ্রেপ্তার ও মামলা দেওয়া হচ্ছে। তিনি কনটেন্ট নির্মাতা এ এম হাসান নাসিমের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
আঞ্চলিক ইস্যুতে নাহিদ ইসলাম পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে “ভয়ভীতি, বঞ্চনা ও সাম্প্রদায়িক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার” অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এসব জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বাংলাদেশমুখী করার যেকোনো চেষ্টা নতুন মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা দাবি করেন। তিনি বলেন, এক মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাত, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত না হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা আবারও ভেঙে পড়তে পারে।’
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কার, মানবাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থিতিশীলতা কখনও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতপ্রকাশ দমন বা প্রতীকী সংস্কারের মাধ্যমে আসতে পারে না। টেকসই স্থিতিশীলতা আসবে গণতান্ত্রিক বৈধতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, সাংবিধানিক জবাবদিহিতা এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতি সম্মান থেকে।’


