যশোরের মনিরামপুর উপজেলার দেলুয়াবাড়ি গ্রামের হাবিবুর রহমানের চায়ের দোকানে বসে কৃষক আশরাফ হোসেন সংসদের আলোচনা নিয়ে তার মূল্যায়নের কথা বলছিলেন।
এবার বোরো ধান চাষ করে উৎপাদন খরচ উঠেনি, সরকার নায্যমূল্যে যে ধান কিনছে তারও সুফল তিনি পাচ্ছেন না। ‘টিভিতে সারাদিন দেখি সংসদে এমপিরা তাদের নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ঝড় তুলছেন। সংসদে এসব আলোচনায় আমাদের মতো মানুষের লাভ কী?’, টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে নিজের হতাশার কথা বলছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পৌনে দুই বছর পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের এবার চলছে দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশন। নানা ধরনের সংকট মোকাবিলা করেই এগিয়ে চলতে হচ্ছে নতুন সরকারকে। আর সাধারণ মানুষের সংকটের তো কোনো সময়সীমা থাকে না।
অভিযোগ উঠেছে, এসব সংকট নিয়ে আলোচনা খুব একটা বেশি হয় না সেখানে, অথচ নির্বাচনের আগে অঙ্গীকার ছিল, সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু হবে সংসদ।
রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এখন এসব বিষয়ে মানুষের মাঝে চলছে আলোচনা। গ্রামের চায়ের দোকান, হাট-বাজার, গণপরিবহন, অফিস-আদালত এবং সামাজিক মাধ্যমে মানুষের প্রশ্ন, কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, কর্মসংস্থানের সংকট, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সংসদে এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন?
রাজনীতি যারা পর্যবেক্ষণ করেন তারাও বলছেন, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত আইনসভায় গণমানুষের সমস্যা-সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয়ই বেশি প্রধান্য পাচ্ছে।
বিশেষ করে গত ৭ জুন বাজেট অধিবেশনের শুরু থেকেই এখন পর্যন্ত গণমানুষের কথা গুরুত্ব পেয়েছে কমই। দেশের অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের নানা সংকটের চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও রাজনৈতিক বিতর্কই বেশি আলোচনায় এসেছে। অধিবেশনে বাজেট বিশ্লেষণও হচ্ছে না খুব একটা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির তথ্যমতে, একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশন (জানুয়ারি ২০১৯–এপ্রিল ২০২৩) পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা ব্যয় হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের খরচও কাছাকাছি বলেই সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে।
তাই প্রশ্ন উঠেছে, এত টাকা ব্যয়ে অধিবেশনে কেন সদস্যদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে অহেতুক সময় নষ্ট করা হবে?
সুশাসনের জন্যে নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার টাইমসকে বলছেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সংসদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কারণ, নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় থেকেই এই গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। কিন্তু বিপরীতে এবারের সংসদেও গত কয়েকদিনে দেখছি, মানুষের সমস্যার থেকে ব্যক্তিগত ইস্যু বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যা দুর্ভাগ্যজনক।’
‘এটি মানতে আসলেই কষ্ট হয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আলোচনা কম হচ্ছে, এটিও হতাশাজনক’, বলেন তিনি।
সাতক্ষীরার কলারোয়ার সীমান্তবর্তী ভাদিয়ালি গ্রামের বাসিন্দা আক্তারুল ইসলামও হতাশ। দক্ষিণ ভাদিয়ালির হাটে বসে তিনি বলেন, ‘কেউ আমাদের কথা সংসদে বলেন না। জিনিসপত্রের দাম কমাতে না পারলে মানুষ আগামীদিনে কীভাবে বাঁচবে, সে আলাপও তো খুব একটা শুনি না সংসদে।’
এটি কেবল এবারের অধিবেশনের চিত্র না। প্রথম অধিবেশন চলাকালে দেশজুড়ে যখন তীব্র লোডশেডিং আর জ্বালানি সংকট, সে সময় সংসদে এ নিয়ে কথা হলেও তা নিয়ে জোরাল আলোচনা হয়নি বললেই চলে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের উদ্বেগ স্পষ্ট। মব করে হামলা, হত্যা, ধর্ষণের মতো ঘটনা নিয়ে আলোচনা মানুষের মুখে মুখে।
কিন্তু সংসদে এক সদস্য যখন তার নির্বাচনী এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বেশ কিছু মানুষের মৃত্যু এবং লোডশেডিং নিয়ে প্রশ্ন করেন, সে সময় জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ টুকু হাসতে হাসতে বলেছেন, লোডশেডিং থাকলে এই মানুষগুলো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো কী করে?


