শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। নির্বাচনী আইন অনুসারে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সব ধরনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সময় শেষ হয়ে গেছে। ভোট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে কার্যকর হয়েছে সব ধরনের সভা, সমাবেশ ও মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা।
এর আগে সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীরা শেষ মুহূর্তের গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। সোমবার ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর রঙিন লিফলেটে ছেয়ে গেছে রাজপথ থেকে গ্রামের অলিগলি। সোমবার সন্ধ্যায় ভোটারদের উদ্দেশে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ভাষণ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের যাত্রাপথ শুরু হয়েছিল গত বছরের ১১ ডিসেম্বর। সেদিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক প্রার্থীদের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর।
এরপর ৩০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। যাথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও আপিল নিষ্পত্তি শেষে গত ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে মোট ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত হয়ে গেছে।
গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। তবে প্রচারের এই ২০ দিনে উৎসবের আমেজের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে শেরপুর জেলার ঘটনাগুলো ছিল সবচেয়ে আলোচিত ও দুঃখজনক। গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠান চলাকালীন মঞ্চে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ বাধে। এতে গুরুতর আহত হয়ে পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম। এই ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হন এবং এলাকায় ব্যাপক উত্তজনা ছড়িয়ে পড়ে। সহিংস পরিস্থিতির এমন অবনতি দেখে ওই এলাকার ওসি ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নির্বাচন কমিশন।
পরবর্তীতে ৪ ফেব্রুয়ারি শেরপুর-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ায় ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছে কমিশন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও ভোলার বিভিন্ন স্থানেও প্রচার চালানো অবস্থায় প্রার্থীদের মিছিলে হামলার খবর পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে সারা দেশে নির্বাচনী সহিংসতায় এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মী আহত হয়েছেন।
সহিংসতা মোকাবিলায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বর্তমানে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে সারাদেশে মোটরবাইক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ ও আনসারের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী এবং বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো মূল্যে ভোটের পরিবেশ শান্ত রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে।


