‘শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে’

‘শেখ হাসিনার আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে’
Advertisement
Advertisement

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দল, মত ও পথ দমনে বলপূর্বক অপহরণ, আটক, গুম, নির্যাতন ও হত্যাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পদ্ধতিগত ব্যবস্থায় পরিণত করা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এমন দাবি উঠেছে। তদন্ত সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ, অনুমোদন ও অবগতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা, নির্দেশনা, সক্রিয় তত্ত্বাবধান ও অংশগ্রহণে এই অপরাধের কাঠামো গড়ে ওঠে। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের ভূমিকা তদন্তে এসেছে বলে দাবি করেছেন মো. রফিকুল ইসলাম।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক এবং পরে এডিজি (অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জিয়াউল আহসান অসংখ্য গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দির পরবর্তী অংশ রোববার ১১ অক্টোবর গ্রহণ করবে ট্রাইব্যুনাল।

জবানবন্দিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তকালে ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্য ও সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দ করা আলামত, পত্রপত্রিকা, ভিডিও ফুটেজ এবং দেশীয় তদন্ত সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দল, সমালোচক, ভিন্নমতাবলম্বী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দমন ও নির্মূলের জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহারের চিত্র পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার রাজপথে সহিংসতা ও মানুষ হত্যার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। এরপর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনের পথ তৈরি করে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসে বলে তদন্তে এসেছে।

ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী ও নির্বিঘ্ন করতে সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে বিরোধী রাজনৈতিক দল, মত ও পথ দমনে ব্যবহার করেছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, এই দমননীতির অন্যতম পদ্ধতি ছিল বলপূর্বক অপহরণ, আটক, গুম, হত্যা ও নির্যাতন।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এসব অপরাধের শিকার হয়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, সমালোচক, ভিন্নমতাবলম্বী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এর মধ্য দিয়ে সমাজে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ তৈরি করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম, অপহরণ ও নির্যাতনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়া হতো। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার অনুপস্থিতির সুযোগে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। সরকারের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য অনুগত বিচারকদের ব্যবহারের সংস্কৃতিও ছিল বলে তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেন।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ, অনুমোদন ও অবগতিতে জিয়াউল আহসানসহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী কর্মকর্তারা পরিকল্পনা, সরাসরি অংশগ্রহণ, নির্দেশনা, সক্রিয় তত্ত্বাবধান ও অনুমোদনের মাধ্যমে গুম, অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের কাঠামো পরিচালনা করেছেন বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ড ছিল পদ্ধতিগত, ব্যাপক এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ।

জবানবন্দিতে জিয়াউল আহসানের ভূমিকা তুলে ধরে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ২০০৯ সালে মেজর পদমর্যাদায় র‌্যাবে পোস্টিং হওয়ার পর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ২০২৪ সালে মেজর জেনারেল হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসর নেওয়া পর্যন্ত তিনি আর তার মাতৃবাহিনী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফিরে যাননি। এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন বাহিনী বা সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেন বলে জবানবন্দিতে বলা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রয়োজনীয় কোর্স বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই এবং কোনো ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড বা ফরমেশন কমান্ডের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও জিয়াউল আহসান মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পান। এটিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জিয়াউল আহসান অসংখ্য বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগ করেন। তার জ্ঞান, নির্দেশ ও অনুমোদনে তার বিশ্বস্ত র‌্যাব সদস্যরা হত্যা, গুমসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করত বলেও জবানবন্দিতে দাবি করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুমের শিকার অনেক ব্যক্তির শেষ পরিণতি এখনো অজানা। কাউকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার নামে, কাউকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত দেখিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতো এবং এসব ঘটনাকে সত্যিকারের বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করতে সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করা হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন

আবার কাউকে দীর্ঘদিন আটকে রাখার পর মিথ্যা মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হতো। কাউকে গুলি করে হত্যা করা হতো, আবার কাউকে গুলি করে পেট ফেড়ে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে একটি লোক দেখানো প্রশাসনিক নির্বাহী তদন্তের মাধ্যমে তা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। নিয়মিত নির্বাহী তদন্তের প্রতিবেদন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত ও পুলিশ প্রতিবেদনে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ গোপন রেখে ভুল ও অসত্য তথ্য দিতে বাধ্য করা হতো বলেও তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে বলে তিনি জানান।

তদন্ত প্রতিবেদনে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি নির্দিষ্ট ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততা বা নেতৃত্বের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথম অভিযোগ

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে তৎকালীন র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল চারজনকে আটক করে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে তিনজনকে জিয়াউল আহসান নিজে গুলি করে হত্যা করেন। চতুর্থ ব্যক্তিকে র‌্যাব সদস্যদের দিয়ে হত্যা করার নির্দেশও তিনি দেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার বাইপাস সড়ক দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। পরে নিহতদের লাশ সরিয়ে ফেলা হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ

২০১০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় জিয়াউল আহসান সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিকসহ আরও কয়েকজনকে আটকের পর হত্যা করেন। তদন্তে এসেছে, চর দুয়ানি ও পশুর-বলেশ্বর নদীসংলগ্ন এলাকা থেকে নজরুল ইসলাম ও অন্যদের আটক করে ট্রলারে তোলা হয়। পরে তাদের হত্যা করে লাশের সঙ্গে সিমেন্টের ভারী বস্তু বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
তদন্তে নজরুল ইসলাম, মাছ ধরার নৌকার মালিক আলকাস মল্লিকসহ অন্তত ৫০ জনকে হত্যা বা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আলকাস মল্লিককে র‌্যাব সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন।

তৃতীয় অভিযোগ

২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সুন্দরবনে পরিচালিত কথিত ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলোকেও জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে।

তদন্তে এসেছে, অন্তত ১৩ জনকে আগে আটক করার পর পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে এসব হত্যাকাণ্ডকে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়। নিহতদের মধ্যে মামুন বা মামুদ, মানান, জিহাদ, সোহাগ, আল-আমিন, আসাদ, বেলাল, শিশির কুমার মণ্ডল, বাচ্চু ও জামালের নাম এসেছে। আরও কয়েকজনের নাম তদন্তে পাওয়া গেছে।

জিয়াউল আহসান এসব অভিযান পরিকল্পনা, নেতৃত্ব ও বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। হত্যার পর লাশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে ঘটনাগুলোকে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হতো বলে তদন্তে এসেছে।

জিয়াউল আহসানের নেতৃত্ব বা নির্দেশনায় হত্যা করা ব্যক্তিদের সংখ্যা এসব তিনটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ঘটনায় তিনি সরাসরি হত্যা করেছেন, হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন অথবা হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন। সব মিলিয়ে অন্তত ১৫০ জনকে হত্যা বা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সজল, নজরুল ইসলাম, আলকাস মল্লিকসহ পরিচিত ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা রয়েছেন।

গুমের শিকার অনেকের পরিণতি এখনো জানা যায়নি বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ কেউ ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছেন বলে সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে, আবার কাউকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আটকের পর গুলি করে হত্যা এবং লাশের পেট কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে এসেছে।

নজরুল ইসলাম মল্লিকের ক্ষেত্রে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত যথাযথভাবে করা হয়নি এবং এর সঙ্গে জিয়াউল আহসানের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যে এলে প্রশাসনিক তদন্তের নামে তা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ময়নাতদন্ত ও পুলিশি প্রতিবেদনে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ আড়াল করা হতো বলেও তদন্তে এসেছে।

তদন্ত সংস্থা এসব কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২)(ক), ৩(২)(গ), ৩(২)(জ), ৪(১), ৪(২) ও ৪(৩) ধারার আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আইনের ২০(২) ও ২০এ ধারায় এসব অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালতে দাবি করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad