ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে সাভারে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) শিবির সমর্থিত প্যানেলের এক নেতা দুই-একটি রগ কেটে ইতিহাস তৈরি করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই নেতার নাম সামিউল হাসান শোভন, যিনি উক্ত গকসুর এজিএস। এটা কোনো গোপন পরামর্শ নয়, তিনি নিজের ফেসবুক পেজে এই বিষয়ে পোস্ট দিয়েছেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রাজু আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ছাত্রশিবিরের যে রগ কাটার ইতিহাস-সেটি এই পোস্টে তারা স্বীকার করে নিয়েছে।
৯০-এর দশকে শিবিরের ওপর পায়ের রগ কাটার মিথ্যা অপবাদ আছে দাবি করে গকসু নেতা শোভন লেখেন, ‘সন্ত্রাস রুখে দিতে প্রয়োজনে দু-একটা রগ কেটে ইতিহাস তৈরি করুন। আপনারা এত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে কী করবেন? তারা (ছাত্রদল) তো ঠিকই আইনকে মিডল ফিঙ্গার দেখাচ্ছে প্রতিনিয়ত।’
সংসদে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে আর ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ চলছে বলে মন্তব্য করে এটিকে ‘জাস্ট একটা ফাজলামি’ হিসেবেও তুলে ধরেন শোভন।
ছাত্রদল ও শিবিরের সাম্প্রতিক মারামারির বিষয়ে তিনি লেখেন, ‘হে শিবির, ওরা আপনাদের চোখ তুলতে পারে, গোড়ালি কাটতে পারে, মাথা ফাটাতে পারে; আর আপনারা সারা জীবন খালি মার খেয়ে প্রতিবাদ মিছিলই করে গেলেন!’
গত সোমবার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পিটুনি দেওয়ার পর শিবিরের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে উল্লাস করে নানা পোস্ট দিয়েছিলেন। পরদিন ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় ১০০ জন আহত হন।
বুধবার গণঅভ্যুত্থান দিবসে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজেও দুই ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষে ৩০ জনের মতো আহত হয়েছেন।

গকসু নেতা ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, ‘তোমাকে আবার জেগে উঠতে হবে, হে শিবির_ক্যাডার_নাসির, দেখ, পুনরায় নব্যসন্ত্রাসের উত্থান হয়েছে।’
রগ কাটার পরামর্শ দিয়ে পোস্ট করার বিষয়টি টাইমসের কাছে স্বীকারও করেছেন শোভন। তিনি বলেন, ‘যে অপবাদগুলো আছে শিবিরকে নিয়ে, তার প্রেক্ষিতেই লিখেছি–প্রয়োজনে এক-দুইটা রগ কেটে ইতিহাস তৈরি করুন।’
তবে এই পোস্টের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে রংপুর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোথাও ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘর্ষের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি।
শোভন বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো কনটেক্সট নেই। এটা জাস্ট আমার একটা অভিমত, আমি জাস্ট প্রকাশ করছি।’
গকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রসংসদের কারও দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। এতে লেখা আছে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে যোগ দিলে অথবা ওই সংগঠনের কোনো পদে নির্বাচিত বা মনোনীত হলে তার সদস্যপদ বাতিল হবে।
তবে নির্বাচনের সময় শোভনের প্রতি শিবিরের আনুষ্ঠানিক সমর্থন ছিল।
২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের পর জামায়াত সমর্থিত ছাত্রসংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ‘ছাত্রশিবির সমর্থিত’ মো. রায়হান খান ও এজিএস শোভনকে অভিনন্দন জানান।
পরবর্তীতে সাদ্দাম তার ওই পোস্টটি মুছে ফেললেও, তার আগেই এর স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে এবং এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।
শিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজাহিদুল ইসলামও ফেসবুক পাতায় একটি পোস্টে লেখেন, ‘গণবিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির চারজন প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে তিনজনই জিতেছে। আলহামদুলিল্লাহ।’
গত ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের ঈদ পুনর্মিলনীতেও শোভনকে অংশ নিতে দেখা যায়। তিনি তার ফেসবুক পাতায় ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘আমরা ছিলাম, আমরা আছি, আমরা থাকব। মুছে যাব না।’
শোভন তা সত্ত্বেও শিবিরের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো পোস্ট হোল্ড করি না। আর একটা মানুষের তো সমর্থন থাকতেই পারে, তাই না?’ অর্থাৎ সাংগঠনিক পদে না থাকার দাবি করলেও শিবিরের প্রতি তার ব্যক্তিগত সমর্থনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেননি।
রগ কেটে দেওয়ার বিষয়ে গকসু নেতা শোভনের এই পরামর্শটি দেখেছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রাজু আহমেদ।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘তিনি যে রগ কাটার কথা বলেছেন, যদি তা বাস্তবে করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে দেশের প্রতিটি ক্যাম্পাসে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের বয়কট করেছে, ভবিষ্যতেও করবে।’
গকসু নেতার মন্তব্য সহিংসতাকে উৎসাহিত করে বলে মত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের বক্তব্য আইন ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়, বরং আইনকে বিদ্রূপ করার শামিল।’


