২০১৩ সালে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৩০ আসামিকে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রসিকিউশনের আবেদনের শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেয়। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের বিষয়ে দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার ৪১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার ১০ জনকে শুনানি উপলক্ষ্যে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, দীপু মনি, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। অসুস্থ থাকায় সাংবাদিক ফারজানা রুপাকে আদালতে হাজির করা হয়নি।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তিনি শুনানিতে বলেন, পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় গিয়েও সন্ধান পাননি। এ কারণে পলাতক আসামিদের হাজির করার জন্য দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল পলাতক ৩০ আসামিকে হাজির করার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১৬ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়।
দ্রুত বিচার শেষ করতে চায় প্রসিকিউশন
শাপলা চত্বরের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল সব মামলাকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখে। তবে শাপলা চত্বরের মামলাটি অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হবে।
শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যার বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঘটনাটিকে ‘রং মেখে অভিনয়’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। তার দাবি, ওই ঘটনায় ৬১ জন আলেম-ওলামাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মামলাটির বিচার নিয়ে অতীতে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মপ্রাণ মানুষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়ার দাবি রয়েছে। সেই দাবির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা হবে।
প্রসিকিউশনের দাবি, শাপলা চত্বরের ঘটনা ছিল একটি জেনোসাইড এবং এটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাদের অভিযোগ, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভূমিকা রাখেন।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য, অভিযানের আগে মন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একটি বৈঠকে গ্রেনেড ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী এবং শিশুসহ অন্যদের হত্যা করা হয় বলে প্রসিকিউশন অভিযোগ করেছে।
প্রসিকিউশনের আরও দাবি, হেফাজতে ইসলামকে নির্মূলের উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারের নির্দেশনায় পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যরা সমন্বিতভাবে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেন। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পর দায়ের হওয়া মামলাগুলোর কার্যকর তদন্ত হয়নি এবং হেফাজতে ইসলাম দীর্ঘদিনেও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার পায়নি।
শাপলা চত্বরের মামলায় প্রাথমিক অভিযোগে ২১ জনকে আসামি করা হয়েছিল। পরে তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন আসামির সংখ্যা বাড়িয়ে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।
এ মামলায় পলাতক ৩০ আসামি হলেন শেখ হাসিনা, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুবউল আলম হানিফ, হাসান মাহমুদ চৌধুরী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মৃণাল কান্তি দাস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওমর ফারুক চৌধুরী, সালাউদ্দিন মাহমুদ ওরফে এস এম জাহিদ, ইমরান এইচ সরকার, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক বিজিবি মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ, লে. জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মো. মনিরুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন, আশরাফুজ্জামান, এস এম মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এস এম শিবলী নোমান এবং বিএম ফরমান আলী।
মামলায় রাজনৈতিক নেতা, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একাত্তর মিডিয়া লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা।
শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রথমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দাখিল করেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। তিনি হেফাজতের নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে অভিযোগটি দাখিল করেন।


