টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে একটি মহিলা হেফজখানার দেয়াল ধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আহত আরও ছয়জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকে অবস্থিত খাতিজাতুল মহিলা হেফজখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত ডিআইজি সিরাজ আমিন বলেন, প্রবল ঝড়-বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের কারণে হেফজখানার একটি দেয়াল ধসে পড়ে। খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন, ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএনের সদস্য ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে চারজনকে উদ্ধার করে ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। পরে আহতদের মধ্যে আরও চারজন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
জরুরি প্রতিক্রিয়া সংস্থা (ইপিআর) ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (ইউএনএসএমএস) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় মোট ১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ছয়জন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ইপিআরের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই মারা যান চারজন। তাদের মধ্যে তিনজন শিশু এবং একজন শিক্ষক রয়েছেন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতালে দুইজন, ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালে একজন এবং ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে একজন মারা যান।
বর্তমানে আহত ছয়জনের মধ্যে ক্যাম্প-৩-এর আইওএম পরিচালিত হাসপাতালে তিনজন, ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালে দুইজন এবং ক্যাম্প-২ এর আইওএম হাসপাতালে একজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে নিহত চার শিক্ষার্থীর পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন— ক্যাম্প-৫-এর এ ব্লকের হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), ক্যাম্প-৩-এর এফ-১ ব্লকের আবদুস শুকুরের মেয়ে উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২) এবং ক্যাম্প-৫-এর এ-৮ ব্লকের মোহাম্মদ ইলিয়াসের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)। পরবর্তীতে হাসপাতালে মারা যাওয়া চারজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বুধবার সন্ধ্যায় টাইমস অব বাংলাদেশকে আট রোহিঙ্গার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদ্রাসার দেয়াল ভেঙে পড়ে একজন শিক্ষক ও ৭ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। টানা ভারী বর্ষণে ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টি পাত অব্যাহত থাকলে আরও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ঝুকিপূর্ণ এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুইটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও নরম মাটির কারণে উদ্ধারকাজ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অভিযান অব্যাহত রয়েছ। ঝুকিপূর্ণ স্থান থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় কক্সবাজার জেলায় ৫১ থেকে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
গত পাঁচদিনে কক্সবাজার জেলায় টানা বর্ষণ, পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে। তার মধ্যে গত শুক্রবার বিকালে ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ঘেঁষা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর পর গত সোমবার রাতে উখিয়া তিনটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়। তাছাড়া একইদিন কক্সবাজার পৌরসভায় পাহাড়ধসে একজন, পেকুয়াতে একজনের মৃত্যু হয়।
এদিকে গতকাল দুপুরে কক্সবাজার দরিয়া নগর এলাকায় পাহাড়ধসে এক নারী ও উখিয়ার হলদিয়া পালংয়ে দেয়াল চাপা পড়ে একজনের মৃত্যু হয়।


