রিসোর্টকাণ্ড: এখন থেকে ৫০১ উদযাপন করবেন মামুনুল

রিসোর্টকাণ্ড: এখন থেকে ৫০১ উদযাপন করবেন মামুনুল
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক | ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

পাঁচ বছর আগে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে এক নারীর সঙ্গে সময় কাটানো ও পরবর্তী ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক। তিনি ৫০১ নম্বরকে বিজয়ের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

২০২১ সালের ৩ এপ্রিলের তুমুল আলোচিত ওই ঘটনা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সংসদে সরেস আলোচনার পর শনিবার নিজের ফেসবুক পেজে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়েছেন হেফাজত নেতা মামুনুল।

সেদিনের ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রীয় মবসন্ত্রাসের পরাজিত ঘৃণ্য প্রজেক্ট’ আখ্যা দিয়ে মামুনুল হক লেখেন, ‘যারা ৫০১ বলে বলে বিকৃত স্বাদ আস্বাদন করে, তাদের প্রতি আমাদের সুস্পষ্ট জবাব হলো ৫০১ আমাদের নয়, বরং ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার নির্লজ্জ দোসরদের পরাজয়ের দলিল।’

‘হাসিনার পরাজয়ের কালিমা হিসেবে ৫০১ কে আমরা আমাদের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করলাম। আমরা এখন থেকে ৫০১ কে সেলিব্রেট (উদযাপন) করব এবং আল্লাহর খাস রহমত প্রাপ্তির আনন্দ উদযাপন করব ইনশাআল্লাহ,’ বলেন তিনি।
রিসোর্টের সেই সঙ্গিনীকে প্রথম স্ত্রী সমমর্যাদা না দেওয়ার শর্তে গোপনে বিয়ে করেছেন উল্লেখ করে মামুনুল দাবি করেন, এতে ইসলামের শর্ত ভঙ্গ হয়নি। যুক্তি হিসেবে বলেছেন, সেই নারী নিজে থেকেই প্রথম স্ত্রীর সমমর্যাদা পাওয়ার দাবি ছেড়ে দিয়েছেন।

হেফাজত নেতা লেখেন, ‘ফকিহগণ কুরআন সুন্নাহর দলিলের আলোকে সাব্যস্ত করেছেন, স্ত্রীর যে অধিকার স্বামীর ওপর ওয়াজিব, তা স্ত্রী স্বেচ্ছায় ত্যাগ করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে।’

তালাকের পর গোপনে বিয়ের দাবি

মামুনুল লেখেন, রিসোর্টের সঙ্গী তারই আমার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন এবং তাদের দুইটি সন্তান রয়েছে। বনিবনা না হওয়ায় তারা উভয়ে স্বেচ্ছায় বিচ্ছেদ ঘটান।

তিনি বলেন. ‘সেই নারী স্বপ্রণোদিত হয়ে ফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তার সহযোগিতা কামনা করেন। আমি আমার পরিবারের কথা বলে এই মর্মে প্রস্তাব দিই, সমতার ভিত্তিতে স্ত্রীদের যেই অধিকার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ইসলামে রয়েছে, আমি সেটা দিতে পারব না। এতে যদি সে সম্মত থাকে, তাহলে আমি তাকে আমার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করব।’

সেই নারী স্বেচ্ছায় প্রস্তাবে রাজি হলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী বিয়ে করেন দাবি করে মামুনুল লেখেন, বিয়ের পর তিনি তাকে ঢাকার মোহাম্মদপুরস্থ কুরআন শিক্ষার কেন্দ্র নূরানি কোর্সে ভর্তি করান। কিছুদিন থাকার পর নিজ আগ্রহে তিনি সেলাই প্রশিক্ষণসহ মেয়েলি কিছু কার্যক্রমের প্রশিক্ষণের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখতে থাকেন।

প্রথমদিকে সেই নারী ঢাকায় তার এক বোনের বাসায় অবস্থান করতেন এবং এরপর স্বেচ্ছায় অন্য বাসায় সাবলেট থেকে বসবাস শুরু করেন।  ‘আমি প্রয়োজন মতো তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতাম এবং সময় দিতাম,’ লেখেন মামুনুল।

অবশ্য ৩ এপ্রিলের সেই রাতের ঘটনার পর মামুনুল ও তার স্ত্রীর মধ্যে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড ছড়ায়, যেখানে তিনি রিসোর্টের নারীকে ‘শহীদুল ভাইয়ের স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।

পাঁচ বছর পর এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে মামুনুল লেখেন, প্রথম স্ত্রীকে বিষয়টি যেভাবে শান্ত মাথায় বললে তার জন্য মেনে নেওয়া সহজ হতো, সেটা করতে পারিনি, তাই তার কাছে সেই নারীর সাবেক পরিচয় বলেছি। যেহেতু স্ত্রী তাকে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী হিসেবেই চিনতেন।

আরও পড়ুন

এরপর সেই নারী মামুনুলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন, সেই মামলায় বহু মাস হেফাজত নেতা কারাগারে ছিলেন।

নিবন্ধনহীন বিয়ে গোপন কেন?

পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনার পর মামুনুলের একটি ভিডিও ছড়ায়, যেখানে তিনি বলেছেন, গোপনে বিয়ে ইসলামে হারাম।
তবে এই দ্বিতীয় বিয়ে গোপন রাখার যুক্তিও দেন হেফাজত নেতা।

তিনি লেখেন, ‘এটা সবাই জানি, আমাদের উপমহাদেশে একাধিক বিবাহ একটা জটিল বিষয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারাই একাধিক বিবাহ করেন, তারা প্রথম পরিবার থেকে একটা সময় পর্যন্ত লুকিয়ে রাখেন। কারণ, পরিবার কোনোভাবেই তা মানতে চায় না।’

সন্তান ও পরিবারে ওই মুহূর্তে অস্থিরতা তৈরি করতে চাননি দাবি করে মামুনুল লেখেন, ‘রাষ্ট্রীয় আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বাধ্যবাধকতার জটিলতায় কাবিন করাটাও সমস্যাপূর্ণ ছিল।’

ইসলামে কাবিন করা বাধ্যতামূলক নয় জানিয়ে তিনি আরও লেখেন, তার প্রথম স্ত্রী বিয়ের সময় রাষ্ট্রীয় আইনে অপ্রাপ্তবয়স্কা ছিলেন। তাই সেই বিয়েরও কাবিন করেননি।

একাধিক বিবাহের বিষয়টি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা জানতেন দাবি করে হেফাজত নেতা লেখেন, ‘রয়েল রিসোর্ট থেকে পুলিশ কর্মকর্তা এএসপি মহোদয় আমার সেই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে একাধিক নির্ভরযোগ্য সুপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে আশ্বস্ত হয়েছিলেন এবং আমার পক্ষে কিছুটা ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফলে তাকে হাসিনা সরকারের চরম নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে।’

রিসোর্টের কেন আমিনা তাইয়েবার পরিচয়

মামুনুলের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্ত্রীর নাম আছে আমিনা তাইয়েবা। আর সেই নারীর পরিচয়পত্রে স্বামীর নাম শহিদুল ইসলাম লেখা। সেই নারীর সঙ্গে কথা বলেই আমিনা তাইয়েবা নাম এন্ট্রি করার দাবিও করেন হেফাজত নেতা।

কোন আইন ভঙ্গ হয়েছে

রিসোর্টে ঘুরতে যাওয়ার ঘটনায় তিনি বা তার সঙ্গিনী বাংলাদেশের প্রচলিত কোনো আইন ভঙ্গ করেছেন কি না, সে প্রশ্ন তুলে‍ মামুনুল লেখেন, ‘আমি অথবা সে আমরা কেউ কি কারো কাছে কোনো অভিযোগ দায়ের করেছি? আমরা তো সেখানে স্বেচ্ছায় গিয়েছিলাম। তাহলে পুলিশের নেতৃত্বে জোরপূর্বক আমাদের ঘরে ঢোকা কোন আইনে বৈধ হলো।’

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একের পর এক ব্যক্তিগত কল রেকর্ড ফাঁস করা এবং অনেক ক্ষেত্রে তাতে বিকৃতি করার বৈধতা কোনো আইনে আছে কি না সে প্রশ্নও রাখেন তিনি। এতে শরিয়তের আইন লঙ্ঘন হয়নি বলেও দাবি করেন হেফাজত নেতা।
এরপর তিনি রাষ্ট্রযন্ত্র, সুশিলতাকে ও ‘দ্বিচারিতা’কে ধিক দেন। মামুনুল লেখেন, ‘রাষ্ট্র চেয়েছিল করতে আমাকে ধ্বংস। আল্লাহ করেছেন আমাকে রক্ষা।’

তবে মামলা কেন?

দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করলেও সেই নারী কেন পরে ধর্ষণের মামলা করেছেন, তার ব্যাখ্যায় মামুনুল দাবি করেন, রয়েল রিসোর্ট থেকে নারী পুলিশ তার সঙ্গিনীকে নিয়ে যায় মাওলানা নোমান কাসেমীর বাসায়। পরে তারাই তার বাবাকে ধরে ঢাকায় সাধারণ ডায়েরি করায় এবং সেই নারীকে নিয়ে যায়।

সেই নারীকে ছয় মাস পর্যন্ত তাদের হেফাজতে রেখে ভীতি প্রদর্শনের কারণে শেষমেশ তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, এমন দাবি করে মামুনুল লেখেন, ‘এমনকি ডিজিএফআইয়ের তত্ত্বাবধানে তাকে আদালতে হাজির করা হয় এবং ডিজিএফআইয়ের একজন লেডি কর্মকর্তা কাঠগড়ায় তাকে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে। পুরো আদালত ছিল সেদিন ডিজিএফআই এর নিয়ন্ত্রণে।’
সেই নারীর সন্তান প্রকাশ্যে মামুনুলের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার জন্য তাকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগও আনেন মামুনুল। তিনি বলেন, আদালতে সাক্ষী দেওয়ার সময় সেই কিশোর ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করে।

সেই নারীর সঙ্গে সবশেষ কী হলো

২০২১ এর ঘটনার পর পরস্পর কিছু মনোমালিন্য সৃষ্টি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও দাবি করেন মামুনুল।

তিনি লেখেন, ‘২০২৫ সালের মার্চ মাসে বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত এমনকি আমার কারাবাসকালীন সময়েও তার ভরণপোষণসহ প্রাপ্য অধিকার আদায় করি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad