জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ড ও নানান অপরাধে জড়িতদের বাদ দিয়ে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’কে ভোটে আনার প্রচেষ্টা চলছে। এ চেষ্টায় দলটির ‘ক্লিন ইমেজধারীদের’ আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ খুঁজছে আওয়ামী লীগ। সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত নন, তবে আওয়ামী লীগের খাঁটি সমর্থক, আবার ইমেজও ভাল এমন ব্যক্তিদের তালিকা করে তাদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সুত্রে জানিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বেই এ প্রক্রিয়া চলছে।
এ প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হলে দলটি বিকল্প হিসেবে জাতীয় পার্টি (জাপা) থেকে নিজেদের প্রার্থীদেরকে মনোনয়ন দিয়ে ভোটে অংশগ্রহণ করাতে চায় আওয়ামী লীগ।
গত সোমবারই সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে রাজধানীর গুলশানে তার বাসায় প্রায় দুই ঘন্টা বৈঠক করেছেন নরওয়ে, সুইডেন এবং ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত। অনেকটাই গোপনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
তারা আনুষ্ঠানিক ভাবে বৈঠকের বিষয়ে কিছু না জানালেও আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা কোনভাবে অংশগ্রহণ করতে চান কিনা এবং কিভাবে দলটি কার্যক্রম ফের শুরু করতে চায় সেটি কূটনীতিকরা জানতে চেয়েছেন। এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এরপর আবার ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের’ তৎপরতা আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য সাবের হোসেন চৌধুরী ফোন ও মেসেজে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, সন্ত্রাস ও গণহত্যার প্রমাণ ট্রাইব্যুনালের কাছে রয়েছে, যা দলটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। আদালতের আদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলে জাপার কাঁধে ভর করাই হবে একমাত্র বিকল্প।
চীফ প্রসিকিউটার তাজুল ইসলাম মঙ্গলবার রাতে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। খুব দ্রুতই তদন্তকাজ শেষ করবেন তদন্ত কর্মকর্তারা। প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে দল হিসেবে বিচারের জন্য আওয়ামী লীগের ব্যাপারেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দলকে নিষিদ্ধ করা বা অন্য কোনও প্রক্রিয়ায় সাজা দেওয়া বিষয়ে আইন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যাসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগে গত ১২ মে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে সাময়িক নিষিদ্ধ করে অন্তর্বতী সরকার। যদি আদালতের মাধ্যমে দলটি নিষিদ্ধ হয় আগামী সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচনেও দলীয় ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাবে আওয়ামী লীগ।
বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতেই পশ্চিমা এবং প্রতিবেশী দেশের কূটনীতিকরা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নানাভাবে নির্বাচনে আসার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতকে কাজে লাগাতে চাইবে দলটি। ভারত নিজস্ব স্বার্থে যে কোনোভাবে আওয়ামী লীগকে ফেরাতে চাইবে।’
‘স্বাভাবিক উপায়ে ফেরানোর সুযোগ কম হওয়ায় জাপার মাধ্যমে দলটিকে সুভিধা দেয়ার চেষ্টা করবে দেশটি,’ বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক।
তবে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম মনে করেন, ‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আর তথাকথিত মানবাধিকারের কথা বলে ভারতের পাশাপাশি পশ্চিমা দেশেরও কেউ কেউ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের আনার কথা বলতে পারে। এসব দেশের গ্রহণযোগ্য বলতে আওয়ামী লীগকে ভোটে আনার চেষ্টা।’
আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নানাভাবে ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ খুঁজছে। ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ গঠনের চেষ্টার পাশাপাশি নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী দিতে বিকল্প চিন্তাও করছে দলটির। দলটির সমর্থক বিশেষ করে পেশাজীবীদের অনেকের কাছে এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এমন দু’জন পেশাজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন। আসন ভিত্তিক দু’জন করে প্রার্থীর সন্ধানও করছে আওয়ামী লীগ। যারা সরাসরি দলের কোন পদ পদবিতে ছিলেন না। কিন্তু নির্বাচনে প্রভাব সৃষ্টির সক্ষমতা রাখেন।
একাধিক সূত্র বলছে, যদি কোনভাবে ‘রিফাইন্ড’ প্রক্রিয়া সম্ভব না হয় তবে জাপার কাঁধে ভর করে নির্বাচনী বৈতারণী পার হতে চায় আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের গত চার টার্ম ক্ষমতার মিত্র জাপাও নিজস্ব স্বার্থই তাদের স্থান দিতে চায়। কেননা, সাতভাগে বিভক্ত জাপার সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল। সব জায়গায় প্রার্থী দেওয়ার মতো অবস্থাও নেই দলটির। এছাড়া আওয়ামী লীগের বড় অংশের ভোট ব্যাংক কাজে লাগাতে চায় জাপা।
দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বেশ সোচ্চার ছিলেন। সম্প্রতি ফ্যাসিস্টের দোসর হিসেবে জাপা নিষিদ্ধে কয়েকটি দল আন্দোলনে নামলেও তাকে নমনীয় হতে দেখা যায়নি। গণঅধিকার পরিষদসহ এসব দলের অভিযোগ আওয়ামী লীগকে পুনবার্সন করতে জাপা নিষিদ্ধে বাধা দিচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দলটিকে নিষিদ্ধের আন্দোলন করতে গিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মার খেয়েছেন গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নুর।
সসম্প্রতি টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জিএম কাদের বলেছেন, ‘দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী আওয়ামী লীগ ও জাপাকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে গ্রহণযোগ্য হবে না।’
তিনি বলেন, ‘যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার করতে হবে।’ আওয়ামী লীগের ‘ক্লিন ইমেজধারীদের’ মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াত ছেড়ে অনেকে আমাদের দলে এসে ভোট করেছেন। সুতরাং যারা পরিছন্ন তাদের মনোনয়ন দিতে সমস্যা নেই।’
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে সারাদেশে জাপা এবং আওয়ামী লীগ পৃথকভাবে প্রার্থী বাছাইয়ে নেমে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগপন্থী ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনের প্রভাবশালীদের জাপা মনোনয়ন দিতে পারে। ইতোমধ্যে এমন তালিকা তৈরির কাজ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ থেকেই এমন তালিকা করা হচ্ছে। নিজেরা ভোটে আসতে না পারলে জাপার মনোনয়ন নিয়েই তারা ভোটে মাঠে নামবেন।
এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে হচ্ছে, সংসদে দলটির সমর্থক প্রতিনিধি সংসদে থাকলে নানা দাবি আদায় এবং দলীয় কর্মীদের মানবাধিকার সুসংহত করতে সহায়ক হবে। সুযোগ বুঝে দলের কার্যক্রম ফেরাতেও সংসদ সদস্যরা ভূমিকা রাখতে পারবেন।


