বগুড়ার কাহালু উপজেলায় অপরিশোধিত তেল আর রাসায়নিক বর্জ্যে স্বাস্থঝুঁকিতে পড়েছে বাখড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী। বিদ্যালয় মাঠের ঠিক পাশেই একটি পরিত্যক্ত পুকুরে অবৈধভাবে অপরিশোধিত তেল ও রাসায়নিক বর্জ্য ফেলার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মুরাইল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এই বর্জ্য ফেলার স্থানটি মারাত্মকভাবে রাসায়নিক দ্বারা দূষিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে এসে ইতোমধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তৈলাক্ত পানি ও বর্জ্যে ডুবে আছে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। আর রাসায়নিক মিশ্রিত ধানের তুষে ভরা হাজার হাজার সাদা বস্তা দিয়ে ভরাট হয়ে আছে পাশের পুকুর।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন বাদশা জানান, এই বস্তাগুলো পচে যাওয়ার পর সেখান থেকে এক ধরণের তেল তৈরি হয়। তার অভিযোগ, এই তেল স্থানীয় দোকানদারদের কাছে কম দামে বিক্রি করা হয়, যা তারা বিভিন্ন ভাজাপোড়া খাবার তৈরির কাজে ব্যবহার করেন।
বাদশা বলেন, বর্তমান আবহাওয়ায় গরম বাড়ার সাথে সাথে রাসায়নিকের তীব্র গন্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক হারে শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রভাব কৃষিখাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন জানান, পুকুর থেকে উপচে পড়া বিষাক্ত পানি পাশের ধানের জমিতে প্রবেশ করে ফসল নষ্ট হচ্ছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এই বর্জ্য ফেলার স্থানটি দ্রুত অপসারণ করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষন করেন আল আমিন।
শরীরের ওপর এ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে নিজের মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা আতোয়ার রহমান। তিনি জানান, দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে এবং বিষাক্ত বাতাস গ্রহণের ফলে তার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পরিবেশ পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত তিনি তার মেয়েকে আর বিদ্যালয়ে পাঠাবেন না বলে জানান।
বাখড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সালাম বলেন, বর্জ্য ফেলার জন্য দায়ীদের মৌখিকভাবে অনুরোধ করা হলেও তারা তা পাত্তা দেয়নি। এ কারণে তিনি গত ১৮ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রেজওয়ান হোসেন জানান, তিনি ইতোমধ্যেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
কামরুজ্জামান নামে স্থানীয় এক যুবক দাবি করেন, ক্ষমতাসীন দলের সাথে জড়িত কিছু ব্যক্তি এই অবৈধ বর্জ্যের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কেউ এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে বা কাজ বন্ধ করার অনুরোধ জানালে তাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
পুকুরের মালিক আবু হানিফ জানান, তিন-চার মাস আগে মধু নামের এক পরিচিত ব্যক্তি মাছ চাষের কথা বলে এক বছরের জন্য পুকুরটি লিজ নেন। কিন্তু লিজ নেওয়ার পরপরই গভীর রাতে পাঁচটি ট্রাকে করে রাসায়নিক বোঝাই ওই বস্তাগুলো এনে পুকুরে ফেলা হয়।
আবু হানিফ বলেন, লিজ দেওয়ার সময় এই কাজের পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। তাকে প্রতারিত করা হয়েছে।
কাহালু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মালিহা খানম বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। তিনি পুরো ঘটনা তদন্ত করে খুব দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।


