রাজশাহীতে আমের বাম্পার ফলনের হাতছানি

রাজশাহীতে আমের বাম্পার ফলনের হাতছানি
Advertisement
Advertisement

রাজশাহী অঞ্চলের দিগন্তজোড়া আমবাগানগুলোতে এখন সোনালি মুকুলের সমারোহ। গাছে গাছে হলুদ আর সবুজের মিতালি জানান দিচ্ছে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা। মুকুলের ভারে নুয়ে পড়া প্রতিটি গাছ এই অঞ্চলের আমচাষি ও বাগান মালিকদের আগামীর বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। গত বছরের লোকসান কাটিয়ে এবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় দিনরাত বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় প্রায় সব গাছেই এবার আশাব্যঞ্জক মুকুল এসেছে। আগাম জাতের কিছু গাছে ইতোমধ্যে সবুজ গুটিও দেখা দিতে শুরু করেছে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে এবার আমের উৎপাদন বিগত সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে রাজশাহী কৃষি বিভাগ।

চাষিরা জানিয়েছেন, গত মৌসুমে ফলন ভালো হলেও শেষ সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে বাজারে সঠিক দাম না পেয়ে চরম লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছিল তাদের। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই তারা বাড়তি সতর্ক। নিয়মিত সেচ প্রদান, আগাছা পরিষ্কার, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগ-বালাই দমনে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহারে কার্পণ্য করছেন না বাগান মালিকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ—এই চার জেলায় বর্তমানে ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। এসব বাগানে মোট তিন কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি আমগাছ আছে।

বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতিমধ্যে এসব গাছের প্রায় ৬৩ শতাংশে মুকুল এসেছে এবং পর্যায়ক্রমে বাকি গাছগুলোতেও মুকুল আসার প্রক্রিয়া চলছে।

গত মৌসুমে রাজশাহী জেলায় দুই লাখ ৬০ হাজার টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চার লাখ ৫০ হাজার টন, নওগাঁয় চার লাখ ৩২ হাজার টন এবং নাটোরে এক লাখ ৩৪ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছিল। কৃষি বিভাগের আশা, এবার অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে এই উৎপাদন আরও বাড়বে।

আরও পড়ুন

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগানের পরিমাণ কিছুটা কমলেও নওগাঁয় তা বেড়েছে। বর্তমানে রাজশাহী জেলায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৭টি আমগাছ রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫৪১ হেক্টর কম। এখানকার ৬০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে।

অন্যদিকে, নওগাঁ জেলায় বাগান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টরে, যেখানে দুই কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩২৫টি গাছের ৭১ শতাংশে মুকুল দেখা গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৭ হেক্টর কম। এখানকার ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৬৫টি গাছের ৭০ শতাংশে মুকুল এসেছে। এছাড়া নাটোরে পাঁচ হাজার ৬৯ হেক্টর জমির ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৭টি গাছের ৫৩ শতাংশে মুকুলের দেখা মিলেছে।

পুঠিয়ার আমচাষি মোহাম্মদ আলী জানান, মুকুল আসার জন্য চলতি বছরের আবহাওয়া শুরু থেকেই বেশ চমৎকার। দিনের কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা রোদের মাধ্যমেই পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, আর ১০ দিন এমন আবহাওয়া থাকলে মুকুলের পরিমাণ আরও বাড়বে। গতবারের বৃষ্টির বিড়ম্বনা মনে করে তিনি এবার কিছুটা শঙ্কিত হলেও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আশাবাদী।

একই সুরে বাঘা উপজেলার চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, গতবারের চেয়ে এবার মুকুল অনেক বেশি। বড় কোনো দুর্যোগ না হলে প্রচুর ফলন হবে। তবে নিশ্চিন্তে বসে থাকার সুযোগ নেই বলে তিনি নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ ও পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, গত বছর যেসব গাছে মুকুল কম ছিল, এবার সেসব গাছেও প্রচুর মুকুল এসেছে। মুকুল টিকে থাকার জন্য তারা চাষিদের এই সময়ে সেচ দেওয়া এবং ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, এবার আমের ফলন অত্যন্ত ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাষিরা যাতে উৎপাদিত আম বিদেশে রপ্তানি করতে পারেন, সেজন্য কৃষি কর্মকর্তারা প্রতিটি উপজেলায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এবার মানসম্মত আম দেশের বাইরেও বিপুল পরিমাণে পাঠানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে রাজশাহীতে আমবাগান কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ভিন্ন এক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী জুলফিকার আলী। তিনি জানান, লাভের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এবং বাজারে সঠিক দাম না পাওয়ায় অনেক চাষি আমগাছ কেটে ফেলছেন। এক সময় ধান চাষ ছেড়ে চাষিরা লাভজনক মনে করে আম চাষে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে চালের চাহিদা ও দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই আবার আম বাগান ভেঙে ধান চাষে ফিরে যাচ্ছেন। এই পরিবর্তনের ফলে রাজশাহীর আম চাষের শীর্ষস্থানটি এখন নওগাঁর দখলে চলে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad