শীতের মিষ্টি রোদে দক্ষিণা বাতাসে দোল খাচ্ছে সরিষার ফুল। রাজবাড়ী জেলার পাঁচটি উপজেলার মাঠের পর মাঠ এখন এক হলুদ ক্যানভাস। সোনালী রোদে ঝিকিমিকি করা এই হলুদ রাজ্যে মৌমাছির গুনগুন আর প্রজাপতির ওড়াউড়ি যেন প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্য।
এই মুগ্ধকর দৃশ্য শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের মনই ভরাচ্ছে না, বরং রাজবাড়ীর হাজারো কৃষকের চোখে বুনছে কোটি টাকার সমৃদ্ধির স্বপ্ন।
রাজবাড়ী জেলা সদরের রামকান্তপুর ইউনিয়নের বারলাহুরিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। ৫৮ বছর বয়সী কৃষক মোঃ আঞ্জু সেখ তার ৮ পাখি জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। তার মতো এই গ্রামের জামসেদ মোল্লা, নজরুল সেখ ও মোঃ আলমগীর হোসেনের মাঠগুলোও এখন হলুদ ফুলের স্বর্গরাজ্য।
দর্শনার্থী আল আমিন খোকন ও শিমুল পারভেজ টিটুল মুগ্ধ হয়ে জানান, শিশির ভেজা সরিষা ফুলের এই হিমেল হাওয়া আর মৌমাছির মধু সংগ্রহের দৃশ্য তাদের এক স্বপ্নিল পৃথিবীতে নিয়ে যায়। উপজেলার প্রতিটি মাঠে এখন শুধু সরিষা ফুলের হলুদ রঙের চোখ ধাঁধানো বর্ণিল সমারোহ।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ীতে মোট ৫ হাজার ৮৩২ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে জেলা সদরে ১ হাজার ৮৩৫ হেক্টর, গোয়ালন্দে ২ হাজার ১৬৫ হেক্টর, পাংশায় ৪০০ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ৯৫৭ হেক্টর এবং কালুখালী উপজেলায় ৪৭৫ হেক্টর জমিতে সরিষা বোনা হয়েছে।
বর্তমানে এই এলাকায় টরি-৭, স্থানীয়, বারি, বিনা ও রায় সহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা চাষ হচ্ছে।
হেক্টর প্রতি এক হাজার ৩০০ কেজি হিসেবে জেলায় মোট ৭ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি মণ সরিষা ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাবে এ বছর রাজবাড়ীতে উৎপাদিত সরিষার বাজার দর দাঁড়াবে প্রায় ৬২ কোটি ৯৮ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা।
কৃষকদের মতে, সরিষা চাষের অন্যতম সুবিধা হলো এর কম খরচ ও সহজ ব্যবস্থাপনা। কৃষক আঞ্জু সেখ জানান, আগাম আমন ধান কাটার পর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতেই বীজ বপন করা যায় এবং এতে সেচ ও নিড়ানির ঝামেলা অনেক কম।
আরেক কৃষক আলমগীর বলেন, বিঘা প্রতি সরিষা চাষে খরচ হয় প্রায় ৫ হাজার টাকা, কিন্তু খরচ বাদ দিয়ে লাভ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। এছাড়া সরিষা চাষের ফলে বোরো আবাদে সারের খরচও কমে যায়। তবে চাষাবাদ ও সারের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার সরিষা চাষেও খরচ কিছুটা বেড়েছে। এরপরও কৃষক নজরুল ও জামসেদ মোল্লা এবার মণ প্রতি অন্তত ৪ হাজার টাকা লাভের আশা করছেন।
কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দীপ্ত কুমার শর্মা জানান, ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং জমির উর্বরতা বাড়াতে কৃষকদের সরিষা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ জনি খান বলেন, তৈল জাতীয় ফসলের আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে সরিষার বীজ ও সার প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এই চাষে খুব বেশি নিড়ানি বা ওষুধের প্রয়োজন হয় না, তাই কৃষকরা কম খরচে বেশি লাভ করতে পারছেন।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার রাজবাড়ীর কৃষকরা সরিষার বাম্পার ফলন ঘরে তুলবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকৃতির এই রূপ আর কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম মিলেমিশে রাজবাড়ীর মাঠে এখন কেবলই হলুদের জয়গান। চলতি মাঘ মাসেই এই সরিষা ঘরে তোলার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে উঠবেন জেলার কয়েক হাজার প্রান্তিক কৃষক।


